আমরা মেরে ফেলতে যাচ্ছি - সুসাকু এনডো

লিখেছেন:সুজাতা পান্থী সরকার

অনুষ্ঠানটা শেষ হতেই ওরা বেরিয়ে গেল। খুব বেশি দেরি করল না। স্টেশন এখান থেকে অনেক দূরে। হাতে তেমন সময়ও নেই। এর পর রওনা হলে ট্রেনটা বেরিয়ে যেতে পারে।

'ওরা' বলতে আমার শ্যালিকা এবং তার স্বামী। ওদের বিয়েটা হল রেজিস্ট্রি করেই। সেই উপলক্ষে গুটিকয়েক আত্মীয়বন্ধু এসেছিলেন। ঠাণ্ডা বা গরম পানীয়ের সাথে সামান্য কিছু জলযোগেরও ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ওরা চলে যেতেই বাড়িটা ফাঁকা হয়ে গেল।

না গিয়ে উপায়ও ছিল না। কারণ দু'জনেরই ছুটি এত কম – যে আজই না গেলে নবদম্পতির মধুচন্দ্রিমা আর হয় না। আর এটা না হলে- বিয়েটা যেন অর্ধসমাপ্ত থেকে যায়। তাই,

ওরা চলে যাবার পর বাড়ির লোকেরা অবশ্য বারবার করে বলেছিল ওদের সঙ্গে একটা হোটেলে গিয়ে নৈশভোজনটা সেরে নিতে। কিন্তু আমার ইচ্ছে করছিল না। ক্লান্ত লাগছিল। একটা অজুহাত দেখিয়ে ফিরে এলাম নিজের আস্তানায়।

আস্তানা মানে হোটেলের ঘর। এই শহরে এসেছিলাম নিজের কাজে। সেই সময় হঠাৎ এই বিয়েটার দিনও স্থির হল। সুতরাং দুটো কাজই সেরে নেওয়া যেতে পারে একসাথে – এই ভেবে চলে এলাম।

হোটেলটা মোটামুটি ফাঁকা। খুব বেশি লোকজন নেই। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বাতাসটা ঠাণ্ডা। ঘরে ঢুকে জানালাটা খুলে দিয়ে একটা সোফায় বসে পড়লাম। আলোটা জ্বালাতে ভালো লাগছে না। পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেট ধরালাম।

হোটেলের মধ্যেই কোনো ঘর থেকে ভেসে আসছে উচ্চকণ্ঠে হাসির শব্দ। মেয়েদের কোন একটা দল গানে-গল্পে মশগুল। বৃষ্টিটা জোরে এল। পাশে কোথাও টিনের চালে জল পড়ছে-টুপ! টুপ! ঘরের জানালা দিয়ে ছাটও আসছে। তবু উঠে বন্ধ করব — সেই প্রয়াসটাও নেই।

আসলে পায়ের ওপর পা তুলে অনেকক্ষণ ধরে একটা জিনিস আমি ভেবে চলেছি। একের পর এক সিগারেট পুড়ছে। ছাইদানিটা প্রায় ভরে গেছে। কতক্ষণ যে এভাবে বসে আছি খেয়াল নেই। তবু ভেবে চলেছি- ভাবছি ……।

যা শুনলাম তা কি সত্যি?

আজই বিয়েবাড়িতে আলাপ হল একটি ঝকঝকে ছেলের সঙ্গে। পেশাটা হয়তো একই বলে পরিচয় জমে উঠতে দেরি হয় নি। শ্যালিকার স্বামীর পিসতুতো ভাই। কথা বলতে বলতে প্রায় ফিসফিস করে সে ডাঃ সুগুরো সম্বন্ধে এমন একটি খবর দিল। তাতে আমি চমকে উঠলাম।

তারপর থেকে ভাবছি। কেবলই ভাবছি।

বসে থাকতে থাকতে বোধহয় একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল।

অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে যেন কিসের ছায়া।– ডাঃ সুগুরো কি? বারবারই তাঁর মুখটা ভেসে উঠছে। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মাথার সাদাকালো চুল। ফোলা ফোলা মুখ। মোটা সোটা শুঁয়োপোকার মতো আঙুল। সব দেখতে পাচ্ছি। একেবারে পরিষ্কার। আরও একবার তাঁর হাতের আঙুলগুলোর শীতল স্পর্শ অনুভব করছি, আমার ডানদিকের ত্বকে। এই মুখ, এই আঙুলের মালিককে ভোলা আমার পক্ষে কোনোদিন সম্ভব নয়। জীবন থাকতে নয়।

পরের দিন বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ল। সকাল থেকেই কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার দাখিল। এরই মধ্যে আমি বের হলাম শহরের সবচেয়ে নামকরা কাগজের অফিসের দপ্তরে যাব বলে। আশা করি যে খবর চাইছি—তার হদিশ সেখানে পাব।

বৃষ্টির দিনে রিসেপশান মোটামুটি ফাঁকা। সুন্দরী মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, -'মাপ করবেন, আপনাদের কাগজের কয়েকটা পুরোন সংখ্যা দেখতে পারি কি?'

মেয়েটি তার চশমার ফাঁক দিয়ে রীতিমত সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে চেয়ে দেখল আমায়। তারপর টেলিফোনে সম্ভবত আর্কাইভের সাথে যোগাযোগ করল।

- 'পুরানো কাগজে আপনি কী দেখতে চাইছেন? কোন প্রবন্ধ?'

- 'হ্যাঁ। একটি প্রবন্ধ।' 

- 'কোন সময় নাগাদ?'

- 'ঠিক যুদ্ধের পরে।' 

- 'কোন ধরনের প্রবন্ধ?'

- 'ফুকুকা মেডিকেল কলেজে মানুষের শিরা, উপশিরা সংক্রান্ত ব্যাপারে একটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার সাথে যে সব ডাক্তার যুক্ত ছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বিচার চলেছিল আদালতে, মনে পড়ছে আপনার?'

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। তার বদলে জিজ্ঞেস করল আবার,

- 'আপনার কোনো অনুমতিপত্র আছে?'

- 'না, না, এরকম কিছুই নেই।'

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়া গেল। তিনতলার একেবারে কোণে আর্কাইভ। সেখানে পৌঁছে 'কী চাই' জানাতেই চশমা-পরা, মোটাসোটা ভদ্রলোকটি একটি বিশেষ তাক দেখিয়ে দিলেন। সেখানে বাঁধাই করে রাখা আছে বহুবছরের দৈনিক সংবাদপত্র।

প্রায় একঘণ্টা ধরে সেই সময়ের বেশ কিছু কাগজ পরপর পড়ে ফেললাম।

ঘটনাটি ঘটেছিল যুদ্ধের সময়। তখন মেডিকেল কলেজের কয়েকজন ডাক্তার কতকগুলি পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা জানতে চাইছিলেন - একজন মানুষের শরীর থেকে কতটা রক্তক্ষরণ হবার পরও সে বেঁচে থাকে। রক্তের বদলে কতটা লবণাক্ত জল শিরা দিয়ে নিরাপদে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। অথবা কতদূর পর্যন্ত ফুসফুসের টিস্যু কেটে ফেলবার পরও সে অক্ষত থাকে।

অনেকদিন ধরে গবেষণার পরে এর ফলাফল সম্বন্ধে তাঁরা প্রায় নিশ্চিতই ছিলেন।

কিন্তু পরীক্ষার শেষ ধাপে প্রয়োজন ছিল কোন জীবন্ত মানুষের শিরা-ব্যবচ্ছেদ, যার ফলে লোকটি মারা যেতে পারে। অবশ্য এরকমটা নাও হতে পারে। সে যেমনই হোক্- জেনেবুঝে এই জাতীয় পরীক্ষার গিনিপিগ্‌ হতে কেউ রাজি হবে, সেরকম আশা করাই বাতুলতা। তাহলে মানুষের ওপর প্রয়োগের অভাবে এধরনের একটি গবেষণা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে? প্রায় মরিয়া হয়ে উঠলেন চিকিৎসক-গবেষকরা।

শেষ পর্যন্ত তাঁরা গোপনে দ্বারস্থ হলেন সরকারি কারাগারের।

তখন যুদ্ধ চলছে। কয়েকদিন আগেই জাপানী সামরিক বাহিনী গুলি করে নামিয়েছিল আমেরিকার একটি যুদ্ধ বিমান। সেই বিমানের আটজন বন্দির ওপর চলল যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তাতে প্রাণও গেল কয়েকজনের।

ফলে তার মূল্য দিতে হল। ব্যাপারটা জানাজানি হবার পর অভিযুক্ত হলেন ওঁরা। আইনের চোখে অপরাধী বারোজনের মধ্যে ছিলেন দশজন ডাক্তার এবং দু'জন নার্স। বিচারপর্ব প্রথমে ফুকুকোতে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয়েছিল য়ুকোহামার বিচারালয়ে। অভিযুক্তদের তালিকায় একেবারে শেষে রয়েছে ডাঃ সুগুরোর নাম। কিন্তু এই গবেষণায় তাঁর কী ভূমিকা ছিল, সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ সেই সময়ের খবরে পেলাম না।

মেডিসিনের অধ্যাপক, যিনি এই গবেষণার প্রধান উদ্যেক্তা ছিলেন, বিচার শুরু হবার কয়েকদিনের মধ্যেই আত্মহত্যা করলেন। বাকি দু'জন ছাড়া অন্যান্যদের জন্য ধার্য হল দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড। আর ভাগ্যবান দু'জন-যাঁদের শাস্তি কিঞ্চিৎ লঘু-তাঁদের কারাবাসের মেয়াদ ছিল দু'বছর। এবং সেই দু'জনের অন্যতম হলেন ডাঃ সুগুরো।

সংবাদপত্র অফিসের খোলা জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে। নিচু হয়ে ভেসে- যাওয়া মেঘগুলো ঝুলছে ভেজা তুলোর মতো। খবরের কাগজের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে বারবার দেখছি শহরের ওপরে বিছিয়ে থাকা আকাশটা অন্ধকার। জমাট। দম বন্ধ করা একটা অনুভূতি ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছে আমার সারা শরীরে।

আর বসে থাকা ঠিক হবে না। কাগজগুলো যথাস্থানে রেখে দিয়ে, রিসেপসনে বসা মেয়েটিকে মৃদু হেসে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে, বেরিয়ে এলাম রাস্তায়।

ঝিরঝিরে বৃষ্টির ফোঁটা চোখেমুখে এসে লাগতে ঝিমঝিমে ভাবটা কেটে গেল। সতেজ লাগল নিজেকে। বাস, লরি, ট্যাক্সি - শব্দ করে যে যার মতো এগিয়ে চলেছে টোকিওর রাস্তা ধরে। যেমন সবসময় চলে। যুবতী মেয়েরা লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বর্ষাতি পরে রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কারুর খুব তাড়া। কারুক গতি শ্লথ। কফির দোকান থেকে মৃদু, ছন্দোময় বাজনার শব্দ ভেসে আসছে পথ চলতি মানুষদের কানে। এক বিখ্যাত গায়িকা কয়েকদিনের মধ্যেই সহরে আসছেন গাইতে। তার হাসি-হাসি মুখের পোষ্টার সিনেমা হলের সামনে।  

কী করব?-সিনেমা দেখব একটা? টিকিট কাউন্টারে হাত বাড়াতে গিয়েও সরিয়ে নিলাম হাতটা। আমার পিছনে দাঁড়ানো যুবকটির তাড়া আছে মনে হল। তাকেই সুযোগ দিয়ে দু'পা হেঁটে একটা কফির দোকানের কাঁচের দরজায় হাত রাখলাম।

- 'হেই মিষ্টার! একটা লটারির টিকিট নেবেন নাকি?'

ছোটো স্কার্ট পরা মেয়েটি কথা বলতে বলতে আমাকে দেখিয়ে দিল বসবার নির্দিষ্ট চেয়ার। মনে মনে হাসলাম-

- 'লটারি'! আমি যে বেঁচে আছি, সেটা কি লটারি নয়? ও তার কতটুকু জানে।

কেমন যেন অবসন্ন লাগছে। সবকিছুই দেখছি। কিন্তু ওপর থেকে। ভেসে যাওয়া মেঘের মতো কোথাও স্থিত হচ্ছে না আমার চোখ। ভাবনাগুলো এখানে দাঁড়িয়ে নেই। কেবলই ঘাই মারছে অতীতে। একটা রোল আর কফির অর্ডার দিয়ে বসে আছি চুপচাপ।

বাবা-মা তাদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঝলমলে মুখে ঢুকে পছন্দসই জায়গা বেছে নিয়ে, চোখ বোলাচ্ছে মেনু কার্ডে। যুবকরা সুন্দরী বান্ধবীদের পাশে নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যাচ্ছে। সবই দেখছি-তাদের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি কঠোর, লম্বা মুখ, ছোটো ছোটো চোখের কোনো অবয়ব। গ্যাস স্টেশনের মালিকের মতো। অথবা চৌকো, চাষাড়ে মুখের সেই লোকটি-যার এখন একটা পোশাকের দোকান আছে চৌরাস্তার মোড়ে। দোকানটা বেশ ভালোই চলে।

আচ্ছা! গ্যাস স্টেশনের লোকটি এখন কী করছে? দিনের ঠিক এই সময়ে? - নিশ্চয় তার সাদা ইউনিফর্মটি পরে ট্রাকের ট্যাঙ্ক ভর্তি করছে। আর ধুলো-পড়া বড়ো কাঁচের জানালার পিছনে পোশাকের দোকানের মালিক?-হাসি হাসি মুখে ক্রেতাকে তার পছন্দের জিনিসটি ধরিয়ে দিয়ে দু'হাতে গুণে নিচ্ছে পোশাকের দাম। এসবই তো বর্তমান।কিন্তু তাদেরও তো কোনো অতীত ছিল একদিন।

কিন্তু আজ কি তাদের মনে আছে সেই পুরনো দিনগুলোর কথা?

কেউ কি ভাবতে পারবে-দু'জনেই এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভাগীদার। দু'জনেই আস্বাদ জানে এক গূঢ় বস্তুর। তা হল-হত্যা।

এই জায়গাটা সম্বন্ধে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি জানতে চাই না একবারও যে এই পশ্চিম মাৎসুবারাতে কত বাড়িঘর আছে। ক'জন লোক বাস করে। আমি কেবল ওদের মুখ থেকে শুনতে চাই- ওই দু'জন কতজন মানুষকে হত্যা করেছে!

সেই সঙ্গে আছে আরও একজন-ডাঃ সুগুরো।

কিন্তু আজ আমি কাউকেই সঠিক চিনতে পারছি না। এই যে-আমার সামনে বসে আছে কোনো একটি পরিবারের স্নেহশীল পিতা। কোনো কারণে সে ধমক দিচ্ছে তার সন্তানকে। হয়তো যুদ্ধের সময় সেও প্রাণ নিয়েছে দু'একজনের। কিন্তু সেদিনের সেই হত্যাকারী মানুষটিই কি আজকের এই পরিবারের দায়িত্বশীল কর্তা? দু'জনেই কি এক? দুটো মুখই কি এক?-মন? তাও কি এক? কি জানি-বুঝতে পারি না।

তেমনই পশ্চিম মাৎসুবারাতে বড়ো কাচের জানালার পেছনে পোশাকের দোকানের মালিক এবং যে আজ ট্রাকের ট্যাঙ্কে তেল ভরে-এই দু'জনেরই মুখে অনেক ধুলো। অতীতের ধূলো। পুরনো মুখটা আর ভালো করে দেখা যায় না তার ফাঁক দিয়ে। কিন্তু বর্তমানটা যেমন সত্যি, অতীতটাও ঠিক তেমনই।

কফির দোকান থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিলাম আমি। ড্রাইভার জানতে চাইল,

- 'কোথায় যাবেন?'

 শুনতে পেলাম, আমি বলছি,

- 'ফুকোকো ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজ।'

 ট্যাক্সিটা চলতে শুরু করল। বৃষ্টিটা থেমে ছিল মধ্যিখানে। এখন আবার জোরে এল। আগের মতোই। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি-ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যে সাজানো প্যাগোডা গাছগুলোর উঁচু মাথা। টিপটিপ করে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা তার সরু মসৃণ পাতাগুলো থেকে।

 বৃষ্টির ফোঁটা না রক্তবিন্দু! ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে।

এসে গেছি। আমি নেমে পড়লাম ট্যাক্সি থেকে। কোথাও কিছু বদলায় নি। জায়গাটা আমার পরিচিত। কেমন এক আবেশে হেঁটে চললাম সামনে-ক্যাম্পাসের মধ্যে দিয়ে।

দুপাশে সাজানো ঝাউগাছের সারি। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে লম্বা, নির্জন পথ। বিশাল ক্যাম্পাসের একেকটা বাড়িতে এক-একটা বিভাগ। বামদিকের বড়ো লাল বাড়িটাতে পড়ানো হয়। ওটা কলেজ। রং বেরং এর পোশাক-পরা ছেলেমেয়ের একটা দল সবে বের হচ্ছে ক্লাস করে। বৃষ্টিটা জোরে পড়ছে বলে তারা একটু দাঁড়াল।

আমার গন্তব্য ওদিকে নয়।

খুব বেশি খোঁজখুঁজি করতে হল না। কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই আমি পেয়ে গেলাম শল্যচিকিৎসার বিভাগটি। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম বাড়িটা। এর প্রতিটি তলা আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে ছবির মতো। যদিও একবার এসেছি এর আগে। কিন্তু যে ঘটনাটি ঘটেছিল- তা মনে রাখবার জন্য একবারের অভিজ্ঞতাই কি যথেষ্ট নয়?

যেন কোনো রোগীকে দেখতে এসেছি, এমন ভান করে গেট দিয়ে গটগট্ করে উঠে গেলাম তিনতলায়।

তিনতলা পর্যন্ত নানা ওয়ার্ড। রোগীরা শুয়ে বা বসে আছে বিছানায়। নার্স ও সেই সময়ের ডাক্তাররা করিডোের দিয়ে আসা-যাওয়া করছে নিজেদের কাজে। কোনো কোনো বিভাগ একেবারে শূন্য। ধারেকাছে কেউ নেই। এমন দেখতে দেখতে আমি উঠে এলাম চারতলায়। যেন কত পরিচিত সবকিছু।

ওপরের করিডোরে পা রাখতেই একটা জীবাণুনাশক ওষুধের গন্ধ এসে ধাক্কা দিল নাকে। ঠিক সেই গন্ধ। কোনো ভুল নেই। সেটা আমি পেয়েছিলাম চারতলার সেই ঘরটাতে। চামড়ায় মোড়া টেবিলটাতে শুয়ে-।

তিনটে ঘর পেরিয়ে এসে চার নম্বর ঘরের মাথায় লেখা-'অপারেশন থিয়েটার'।

আমার পা থেমে গেল আপনা থেকেই এর সামনে এসে। দরজাটা ঠেলে উঁকি দিলাম ভেতরে। কেউ কোথাও নেই। জানালার ধারে চামড়ায় মোড়া দুটো অপারেশন টেবিল রাখা রয়েছে আগেরই মতো। ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে তাদের একটির ওপর হাত রাখতেই মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। উবু হয়ে বসে পড়লাম মেঝেতে। এবং সেইভাবেই বসে রইলাম অনেকক্ষণ। আমি কি কিছু খুঁজছি?

মনে মনে আমি বোধহয় খুঁজছিলাম-এই অন্ধকার ঘরে, ওই কোণটাতে ডাঃ সুগুরোর স্ফীত, ধূসর মুখটি। ঠিক যেমনটি ছিল কয়েক বছর আগে। চমকে উঠে আবিষ্কার করলাম -আসলে আমি তাকে এখানেই দেখতে চাইছি।

খুব যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায়। চোখে প্রায় কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বমি আসছে। দেওয়াল ধরে কোনমতে সিঁড়ির কাছে উঠে এলাম। ছাদের দরজাটা খোলা।

ছাদে এসে দাঁড়াতেই মনে হল-ফুকুকো হাসপাতালটা যেন গুঁড়ি মেরে অতিকায় জন্তুর মতো এগিয়ে আসছে আমার দিকে-গিলবে বলে। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত নীল সমুদ্রটা। ওদিকে তাকিয়ে তবু যেন আশ্বস্ত লাগছে নিজেকে।

আমার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। কিছু দেখতে পাচ্ছি না সামনে। কিন্তু কী দেখতে চাইছি আমি?

 

সেদিন প্রায় বেলা তিনটে বেজে গেছে। এতক্ষণের মধ্যে টোডা আর সুগুরো কয়েকটামাত্র কথা বলেছে। যখন টোডা ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে গেল-সুগুরো কিছু করবার না পেয়ে বসে রইল নিজের ডেস্কে।

অন্যদিন সে ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে নানারকম কথা বেশ জোরে জোরে বলতে বলতে তার কাজগুলো সারে। কিন্তু আজ যে কী হল-কেবলই মনে হচ্ছে সবকিছুই আগে থেকে স্থির হয়ে আছে এবং একেবারে ঠিকঠাক ছকে।

সুতরাং আজ তার কিছুই করবার নেই বা বলবার নেই। কেবল বেলা তিনটে পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া। তাই টোডা যখন ল্যাবরেটরিতে ফিরে এল-সুগুরো উঠে হলের দিকে গেল। যেন হঠাৎ তার কিছু মনে পড়ে গেছে। আবার একটু পরে যখন সে ফিরে এল দেখতে পেল-টোডা তার ডেস্কের ওপরে নোটবই খুলে রেখে কোথাও গেছে।

আসলে আজ তারা দু'জনেই দু'জনকে এড়িয়ে চলছে, যাতে কোনোভাবেই কারুর সাথে কোনো বিষয়ে মতবিনিময় না হয়।

শেষে, যখন তিনটে বাজল, সুগুরো উঠে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে দরজায় হাত রাখল। কিন্তু তাকে আটকাল টোডা।

- 'এই, তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?'

- 'না, আমি তোমাকে মোটেই এড়িয়ে চলছি না।' 

- 'আর কোনো উপায় নেই কিন্তু জানো তো।'

কিছুক্ষণ ধরে টোডা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সুগুরোর মুখের দিকে। তারপর একটা বাঁকা, তিক্ত হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। তারা দু'জনেই দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি, কোনো কথা না বলে।

সারা হাসপাতালে কেমন যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রোগীরা অপেক্ষা করছে বাইরে চুপচাপ। মাত্র কয়েকজন ছাড়া কেউ জানে না—কী ঘটতে চলেছে, আর আধঘণ্টা পরে।

এমনকি নার্সদের ঘর থেকেও কোনো সাড়া নেই। হাসপাতালকে এত শান্ত এর আগে কোনোদিন কেউ দেখেনি।

যাই হোক-তারা দু'জন যখন ল্যাবরেটরি ছেড়ে অপারেশন থিয়েটারের দিকে এল, মনে হল আবহাওয়াটা এখানে যেন একটু হালকা। করিডোর দিয়ে যেতে যেতেই তারা শুনতে পেল হাসির শব্দ। চার-পাঁচজন সামরিক উর্দি-পরা অফিসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে। আর নিজেদের মধ্যে নানারকম মজার কথা বলছে বেশ জোরে জোরেই। যেন এটা হাসপাতাল নয়-আড্ডাখানা। খোশমেজাজে অপেক্ষা করছে, গালগল্প চালাচ্ছে। একটু পরেই দুপুরের খাবার দেওয়া হবে যেন।

- 'কী ব্যাপার বলতো, কয়েদিগুলো এখনও এল না?'

ডাঃ সিবাতার ঘরে আর্মির এই মেয়েলি চেহারার মেডিকেল অফিসারকে সকাল থেকেই দেখেছে অনেকে। তিনি তাঁর ক্যামেরা কেসটি খুলতে খুলতে বললেন একথা।

- 'অর্ডার অনুযায়ী তো তিরিশ মিনিট আগে তাদের কমপাউন্ড থেকে বের হবার কথা। তাহলে তো অনেক আগেই তাদের চলে আসা উচিত ছিল।'

 গোঁফে তা দিতে দিতে, ঘড়ি দেখে অন্য অফিসারটি জানালেন,

- 'যাই হোক্, আজ কিছু ভালো ছবি তোলা যাবে, আশা করি।'

মেঝেতে কিছুর দাগ ছিল। বুটের ডগা দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন মেডিকেল অফিসারটি।

 - 'তুমি কি ক্যামেরাটায় ঠিকঠাক ছবি তুলতে জান? এটা একটা খুব ভালো ক্যামেরা।'

 - 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব জানি। এটা তো জার্মান ক্যামেরা। আগে এটা দিয়ে কত ছবি তুলেছি। এর পরেই হসপিটাল ডাইনিং রুমে লেফটেন্যান্ট ওমরির বিদায় সম্বর্ধনা আছে। সেটা বিকেল পাঁচটা তিরিশে। এখানকার কাজ তো পাঁচটার মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তারপর ওখানে বেশ ভালোই জমবে।'

 - 'কী খাবার থাকবে, খবর পেয়েছ কি?'

 - 'ভালো কিছু থাকবে নিশ্চয়। তবে কয়েদিগুলোকে ধন্যবাদ। তাদের দৌলতে আমেরিকান লিভারের স্বাদটা বোধহয় পাওয়া যাবে আজ।'

টোডা ও সুগুরোর দিকে কোনোরকম দৃত্পাত না করেই হেসে উঠল ওরা। অপারেশন থিয়েটারের দরজা খোলা। কিন্তু ভেতরে ডাঃ অ্যাসাই বা ডাঃ সিবাতা কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

- 'তুমি জান, চীনে...' মেডিকেল অফিসারটি নতুন একটা গল্প ফাঁদতে শুরু করেছে সবে। 'একটা প্রজাতি আছে। যারা লিভার খেতে খুব পছন্দ করে। তবে যে সে লিভার নয়। মানুষের। সুযোগ পেলেই মানুষ মেরে লিভার খায় তারিয়ে তারিয়ে।'

- 'তাহলে তুমি কি বলতে চাও, আজ রাতে এরকমই একটা পদ বরাদ্দ থাকছে, তোমার জন্য।'

সেই মুহূর্তে ডাঃ অ্যাসাই ধীরে ধীরে হেঁটে আসছিলেন করিডোর দিয়ে। রিমলেস চশমার পিছনে তাঁর উজ্জ্বল দুটো চোখ এখন আরও তীক্ষ্ণ। তাঁর পা ফেলবার ভঙ্গিই বলে দেয় যে মানুষটির মধ্যে আছে দৃঢ়তা এবং কর্তৃত্ব করবার ক্ষমতা। ব্যক্তিত্বময় লোকটি এসে দাঁড়াতেই কথা বলা থামিয়ে অফিসার দু'জন তাকাল তার দিকে। একটুও উত্তেজিত না হয়ে তিনি জানালেন,

 - 'যাদের আসবার কথা ছিল, তারা এসে পৌঁছেছে।'

 - 'বন্দিরা?'

 - 'হ্যাঁ, তারাই।'

 - 'কিন্তু, সিবাতা? ডাঃ সিবাতা কোথায়?'

 - 'তিনি এক্ষুনি এসে পড়বেন। কোনো তাড়া নেই।'

এই বলে তিনি তাকালেন টোডা আর সুগুরোর দিকে। দু'জনেই দাঁড়িয়েছিল দেওয়ালে হেলান দিয়ে। যেন তাদের ওপর যে ভার ন্যস্ত হয়েছে- কোথাও তারা তা নামাতে চাইছে, হাল্কা হতে চাইছে।

- 'তোমরা আমার সঙ্গে এস। তোমরা দু'জনেই।'

 তারা ভেতরে আসতেই ডাঃ অ্যাসাই অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। একটু থেমে গম্ভীর হয়ে বললেন,

- 'ওরা, এসে গেছে। হয়তো আন্দাজ করছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। কিন্তু কোনোমতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না-কেন ওদের আনা হয়েছে এখানে। অথবা ওদের নিয়ে আমরা কী করতে চাই। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।'

- 'ওরা কি কিছুই জানতে চায়নি?'

- 'নাঃ! কেননা ওদের বলা হয়েছে যে অন্য ক্যাম্পে নিয়ে যাবার আগে এটা একটা রুটিন চেক-আপ।'

কথা বলতে বলতেই ডাঃ অ্যাসাই ইথারের আধারটি তাক থেকে তুলে নিয়ে, হাতে ধরে বললেন,

- 'আমি অ্যানাস্থেসিয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে চাইছি, বুঝেছ। আজ দু'জন বন্দি আসছে। তাদের মধ্যে একজনের কাঁধে ক্ষত আছে। তাকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তাকে বললেই হবে যে চিকিৎসার জন্য তাকে অজ্ঞান করা হচ্ছে। কিন্তু অন্যজনকে বিশ্বাসযোগ্য কিছু না বললে সে ঝামেলা করতেই পারে। তাই তারা এখানে এসে গেলে - আগে তাদের আমরা বসতে বলব ও ভান করব যেন তাদের আমরা পরীক্ষা করছি।

শেষে বলব, জামা খুলে শুয়ে পড়তে। যাতে ভালো করে হার্টটা পরীক্ষা করা যায়। ঠিক আছে তো সব? বুঝে নিয়েছ ভালো করে?'

- 'আর তখনই তো তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলব আমরা, তাই না? নইলে অ্যানাস্থেসিয়া দেবার পরে তারা হাত-পা ছুঁড়তে পারে।'

- 'ঠিক বলেছ, সুগুরো। এ বিষয়ে নতুন করে বলবার কিছু নেই। আমি কিন্তু তোমার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছি।'

- 'নিশ্চয় ডক্টর। আমি চেষ্টা করব সাধ্যমতো।'

 রোগী পুরোপুরি অজ্ঞান হবার আগে তিনটে ধাপ থাকে। সেটা সামাল দেওয়াই শেষ কথা নয়। অপারেশন চলাকালীনও খেয়াল রাখতে হয়-রোগীর অবস্থা কেমন।

এই কাজের পুরো দায়িত্ব টোডা এবং সুগুরোর ওপর।

- 'কিন্তু সেই বৃদ্ধ মানুষটি ও ডাঃ সিবিতা কোথায়? তারা তো এখনও এলেন না?'

- 'নিচের ঘরে গাউন পরছেন। বন্দিরা অ্যানাস্থেসিয়া পাবার পরে অজ্ঞান হলে, তবে ওঁদের ডেকে আনব। এতজনকে একসাথে দেখলে ওরা প্রথমেই ঘাবড়ে যেতে পারে।'

সবকিছু শোনবার পর সুগুরোর কেমন যেন মনে হচ্ছে-ব্যাপারটা কিছুই নয়। নিয়ম মাফিক একটা অপারেশন হবে। এবং তিনি এতে অংশ নেবেন। যেমনটা এই হাসপাতালের বহু অপারেশনে আগে তিনি নিয়েছেন। অসুবিধা কিছু নেই।

কিন্তু 'বন্দি' শব্দটাই সব কিছু গোলমাল করে দিচ্ছে। তিনি সহজ হতে পারছেন না।

কেন সাধারণ যে কোনো মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী নয় - যাদের ওপর এতাবৎ পরীক্ষা চলেছে। অবশ্য যুক্তির দিক দিয়ে বিচার করলে, মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর ওপর তাদের গবেষণা আর এখন চলতে পারে না। সে স্তর তাঁরা পেরিয়ে এসেছেন। মানুষের ওপর প্রয়োগই প্রয়োজন। কিন্তু তেমন কে আছে, যে স্বেচ্ছায় নিজেকে তাদের হাতে ছেড়ে দেবে? অপারেশন টেবিলে শুয়ে পড়বে ডাক্তারদের ছুরি-কাঁচির নিচে? সুতরাং এই ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া ছাড়া তো অন্য কোনো উপায়ও নেই। কিন্তু বিবেকদংশন তিনি এড়াতে পারছেন না। লোকটি যদি মারা যায়! কী জবাবদিহি করতে পারেন তিনি! এটা কি ছেলেখেলা হচ্ছে না?

এখন এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি-যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়। চিন্তার কোনো অবকাশ এখানে নেই। হয় শক্ত হাতে যা ঘটবে তাতে অংশগ্রহণ করা অথবা এখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া।

'আমরা একটি লোককে প্রায় মেরে ফেলতে যাচ্ছি'-যে মুহূর্তে কথাটা মনে এল আবার, ভয় আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে লাগল তার ভেতরটা। পড়ে যেতে যেতে সজোরে চেপে ধরলেন অপারেশন থিয়েটারের দরজার হ্যান্ডেলটা। দরজাটার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মেডিকেল অফিসারদের লঘু কথাবার্তা। টুকরো হাসির শব্দ।

তাদের গুরুত্বহীন কথা ডাঃ সুগুরোকে থামিয়ে দিল বাইরে পা রাখতে। সামনে যেন এক বিশাল দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে মাথা তুলে। তাতে কোনো ছিদ্র নেই। খাঁজ নেই, প্রাণ নেই, পালাবার পথ নেই। সেই দেওয়ালটা যেন সরে, নড়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।

বিস্ফারিত চোখে ঘরের ভেতরে তাকিয়ে দেখলেন-ঘরের ছাদ থেকে ঝোলানো আলোয় সবকিছু কেমন যেন মায়াবী। গম্ভীর। থমথমে। আলোটা নেমে এসেছে অপারেশন টেবিলের ওপর। টেবিলটা ফাঁকা। যেন কারুর জন্যে অপেক্ষা করছে। পাশে মৃদু আলোয় চক্চক করছে ওয়াটার পাইপটা। একটু পরেই তার মধ্যে থেকে জলের ধারা বেরিয়ে এসে ধুয়ে দেবে, মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তের রেখা। সবকিছুই প্রস্তুত।

ডাঃ অ্যাসাই ও টোডা নিঃশব্দে তাদের জ্যাকেট আর জুতো খুলে রেখে পরতে শুরু করেছে সার্জিকাল গাউন এবং অপারেশন থিয়েটারের জন্য উপযুক্ত চটি।

এমন সময় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল হাসপাতালের প্রধান নার্স-ওবা। তার মুখ সবসময় মুখোশের মতো অভিব্যক্তিহীন। সেই মুখ দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় যে আদৌ তার মন আছে কিনা।

ওবার সঙ্গে এঘরে এল আরও একজন – উডা। সেও নার্স। তার মধ্যে এমন এক কাঠিন্য আছে যে জন্য লোকে প্রায় সবসময়ই তার সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলে। এছাড়া অনেকে বলে তার গায়ের গন্ধ নাকি হাসপাতালের গন্ধের চেয়েও কড়া। ওবা ঘরে ঢুকেই পেশাদারী ভঙ্গিতে ছুরি, কাঁচি, গজ, তুলো এবং অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সব সামগ্রী অপারেশন টেবিলের পাশের ছোটো কাচের টেবিলটার ওপর সাজিয়ে রাখতে শুরু করল।

কারুর মুখেই কোনো কথা নেই। শব্দ বলতে কেবল বাইরের করিডোরে গল্পগুজবের টুকরো আওয়াজ এবং জলের নল থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়বার শব্দ - যা এক্ষুনি শুরু হয়েছে।

সুগুরো কিন্তু খুব অবাক হয়ে গেছেন প্রধান নার্স ওবার সঙ্গে উডাকে দেখে। তাকে অনেকদিন হাসপাতালে কেউ দেখেনি। সুগুরো যখন হাসপাতাল পরিদর্শনে বের হন- তখনও তাকে দেখা যায় না। শেষ কবে তার সাথে কাজ করেছেন তিনি মনে করতে পারলেন না। অদ্ভুত, রহস্যময় মেজাজের এই মহিলা কেন যে আজই এখানে-ঠিক বোধগম্য হল না তাঁর।

হঠাৎ করিডোরের আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল। নিস্তব্ধতা যেন বড়ো বেশি চেপে বসল অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজার এধারে। সুগুরো টোডার দিকে চেয়ে দেখলেন- তার মুখটা পাংশুবর্ণ ধারণ করেছে। টোডা যে টোডা, সবকিছুতেই একটা 'দেখা যাবে' ধরন। সে কি এবার আতঙ্কিত হচ্ছে! সে তার দিকে মজা করে কাঁধ ঝাঁকাল। ভাবটা যেন এস চ্যালেঞ্জটা নিয়েই দেখি আমরা-। কতদূর কি হয়। এত বেশি সপ্রতিভতা কি ভেতরের ভয় ও অস্বস্তিটা তাড়াবার জন্যে?

দরজাটা খুলে গেল। গোঁফে তা দিতে দিতে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মোটাসোটা মেডিক্যাল অফিসারটি দ্রুত ঢুকে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে, সাতজনকেই প্রশ্ন করলেন,

- 'সবকিছু প্রস্তুত এখানে?'

- 'একজনকে আগে আন।' ডাঃ অ্যাসাই এর কণ্ঠস্বর কাঁপা কাঁপা শোনাল। 'ক'জন এসেছে আজ? দু'জনকেই কি আনা হয়েছে?'

- দু'জন।'

ঘরের আবহাওয়াটা গুমোট। কেউই তাকাচ্ছে না কারুর মুখের দিকে। সুগুরো নিজেকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেছে দেওয়ালের ধারে। সেখান থেকেই সে দেখতে পেল একজন রোগা, লম্বা লোককে প্রায় ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল ঘরের মধ্যে। তার গায়ে সবুজ, দোমড়ানো মোচড়ানো কয়েদিদের পোশাকটি ঢলঢল করছে।

সে ঘরে ঢুকেই সুগুরো এবং অন্যান্যদের দেখে-অসহায়ভাবে একটু হাসল। তারপর তাকিয়ে রইল সামনের সাদা দেওয়ালের দিকে। তার জানা নেই, এরপর কী করতে হবে।

-'এখানে বস'।

ইংরেজীতে ডাঃ অ্যাসাই তাকে বসতে বলে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। সে পা দুটো ভাঁজ করে বসে পড়ল চেয়ারটায়। কোনো প্রশ্ন করল না। ডাক্তারদের তো লোকে এমনিতেই বিশ্বাস করে। সেও যে করবে, তেমনটাই স্বাভাবিক।

সুগুরো সিনেমা দেখতে ভালোবাসে। সময় পেলে, হাতে তেমন কাজ না থাকলে সে টিকিট কেটে বসে পড়ে অন্ধকার সিনেমা হলের শেষের দিকের চেয়ারে। বিশেষ করে যদি গ্যারি কুপারের কোনো ছবি হয়। এই আমেরিকান বন্দির সাথে-চেহারায় বা বসবার ভঙ্গিতে কোথাও একটা মিল আছে গ্যারি কুপারের সঙ্গে।

যখন নার্স ওবা তার জ্যাকেটটি খুলে নিল, সবাই দেখতে পেল যে সে ভেতরে পরে আছে ছেঁড়া, জাপানীদের তৈরি একটা গেঞ্জী। গেঞ্জীর মধ্যে থেকে তার বাদামী রঙের বুকের লোম উঁকি মারছে।

ডাঃ অ্যাসাই স্টেথোস্কোপটা তার বুকে বসাতেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় নীরব হয়ে ডাক্তারদের হাতে সঁপে দেওয়া ছাড়া তার আর কিছু করবার নেই। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ-যা এই ঘরের বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন ছোবল মারল তাকে। চমকে উঠে তাড়াতাড়ি চোখ খুলে নড়েচড়ে বসল।

- 'গন্ধটা ইথারের। তাই না?'

সে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডাঃ অ্যাসাইকে জিজ্ঞাসা করল।

- 'ঠিক ধরেছ। এটা তোমাকে ভালো করে তুলবে।'

কথাটা বলতে গিয়ে ডাঃ অ্যাসাই- এর কণ্ঠস্বর কি সামান্য ধরে গেল অথবা তাঁর কি হাতে ধরা স্টেথোস্কোপটা কাঁপছে?

পরীক্ষা যত এগিয়ে চলেছে-রোগীর নির্ভরতা ততই বাড়ছে। সবাই ভালো করেই বুঝতে পারছে সে কথা। সে ক্রমশ নিজেকে শিথিল করে দিয়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে ডাঃ অ্যাসাই-এর নির্দেশ। তার শান্ত নীল চোখ ও বন্ধুত্বপূর্ণ হাসিতে কোথাও কোনো অবিশ্বাসের ছাপ নেই। ডাক্তারদের ভূমিকা সম্বন্ধে সে এত নিশ্চিত যে বন্দি হিসেবেও তাদের সে শত্রুপক্ষ বলে মনে করছে না। যখন ডাঃ অ্যাসাই তার হার্ট পরীক্ষা করবেন বলে পাশের অপারেশন টেবিলটায় শুয়ে পড়তে বললেন, সে কোনো আপত্তি না করে তৎক্ষণাৎ শুয়ে পড়ল।

- 'তাহলে এবার স্ট্র্যাপগুলো বেঁধে দিই,' টোডা অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।

- 'একটু পরে।' নিচু গলায় প্রায় ফিস্ফিস্ করে উত্তর দিলেন ডাঃ অ্যাসাই। এক্ষুনি যদি বাঁধ, তবে সন্দেহ হবে। অ্যানাস্থেসিয়া দেবার পরে যখন দ্বিতীয় ধাপটা আসবে বা যদি বুকে ব্যথা হয়, সেসময় স্ট্র্যাপটা বেঁধে দিও।'

- 'মেডিক্যাল অফিসাররা জিজ্ঞেস করছে, যে তারা কি এবার আসবেন?'

পাশের ছোট ঘরটা থেকে মাথা বাড়িয়ে নার্স ওবা জিজ্ঞাসা করল।

- 'না, এখনও নয়। সময় হলে আমি জানাব। সুগুরো, অ্যানাস্থেসিয়া মাস্ক তৈরি আছে?'

- 'না। আমি পারব না, ডাঃ অ্যাসাই। আমাকে যেতে দিন। আমি বাইরে যাব।'

সুগুরোর কণ্ঠস্বর ভেঙে পড়েছে। শক্ত করে সে ধরে রেখেছে চেয়ারের একটা কোণ।

ডাঃ অ্যাসাই তার রিমলেস্ চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে দেখল সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে। কোনো কথা বলল না।

- 'ডাঃ অ্যাসাই, আমি করছি।' সুগুরোর জায়গায় দাঁড়িয়ে টোডা অ্যানাস্থেসিয়া মাস্কের ওপরে তুলোর পরত চাপাতে চাপাতে বলল।

বন্দিটি এতক্ষণ টেবিলে শুয়ে দেখছিল সবকিছু চুপচাপ। সে কোনো কথা জিজ্ঞাসা করবার জন্য যেই তার ঠোঁট দুটো ফাঁক করেছে অমনি ডাঃ অ্যাসাই হেসে, তাকে কথা বলবার কোনো সুযোগ না দিয়ে, তার মুখে জোর করে চেপে ধরলেন অ্যানাস্থেসিয়া মাস্কটি। তরল ইথার ঢালা হল তার ওপর। মানুষটি প্রাণপণে মাথা দু'পাশে নাড়িয়ে চেষ্টা করতে লাগল মাস্কটি আলগা করবার। পা দুটো ওঠানামা করছে টেবিল থেকে শূন্যে। হাত দিয়ে চেষ্টা করছে সে সামনে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরতে।

- 'স্ট্র্যাপ, স্ট্যাপ।'

দু'জন নার্স নিচু হয়ে অপারেশন টেবিল-এর স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে ফেলল তার পা, আর দেহ। 

- 'প্রথম ধাপ।'

নার্স উডা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। এই সময়ে রোগী বুঝতে পারে যে সে জ্ঞান হারাচ্ছে। তখন স্বাভাবিক ভাবেই চেষ্টা করে প্রতিরোধের।

- 'ইথার ঢালা বন্ধ কর।'

ডাঃ অ্যাসাই বন্দির হাত চেপে ধরে নির্দেশ দিলেন টোডাকে।

মাস্কের নিচ থেকে একটা জন্তুর মতো গোঙানি ভেসে আসতে লাগল। এটা অ্যানাস্থেসিয়ার দ্বিতীয় ধাপ। এই সময় রোগী খুব রেগে যায়। অনেকে আবার গান গাইতেও আরম্ভ করে। কিন্তু এই লোকটি কুকুরের মতো গর্জন করছে থেকে থেকে।

- 'উডা, আমার স্টেথোস্কোপটা দাও।'

উডার হাত থেকে যন্ত্রটা নিয়ে ডাঃ অ্যাসাই তাড়াতাড়ি এটি চেপে ধরলেন রোগীর লোমশ বুকে।

- 'উডা, আবার ইথার দিতে শুরু কর।'

- 'ঠিক আছে, ডক্টর।'

- 'নাড়ির গতি খুব ধীর।'

ডাঃ অ্যাসাই বন্দির হাত ছেড়ে দিতেই তারা 'ধূপ' করে পড়ে গেল টেবিলের ওপর, দেহের দু'ধারে। তখন ডাঃ অ্যাসাই প্রধান নার্সের হাত থেকে টর্চ নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন তার চোখ।

- 'না, কর্ণিয়াতে কোনো প্রতিফলন নেই। এবার শুরু করা যেতে পারে। ঠিক আছে, তোমরা তৈরি হও। আমি যাচ্ছি সেই বৃদ্ধ মানুষটি এবং ডাঃ সিবাতাকে ডেকে আনতে।'

এই বলে তিনি তাঁর গাউনের পকেটে স্টেথোস্কোপটা ঢুকিয়ে রাখলেন। তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন আবার,

- 'ইথার, ঢালা বন্ধ কর। ইথার যদি বেশি পড়ে যায়, তাহলে লোকটি মারা যাবে। সেটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। মিস্ ওবা, একটু খেয়াল রাখ।'

সুগুরোর দিকে একটা শীতল, বক্র দৃষ্টি হেনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ডাঃ অ্যাসাই। নার্স দু'জন পাশের ছোটো ঘরটায় গিয়ে ডাঃ অ্যাসাই-এর নির্দেশমত যন্ত্রপাতি সাজিয়ে রাখতে লাগল ভাবলেশহীন মুখে।

ছাদ থেকে ঝোলানো আলোটার নীলাভ দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে। সুগুরোর মুখটা ভয়াবহ এক জন্তুর মতো প্রতিবিম্বিত হচ্ছে দেওয়ালে। নিজেকেই চিনতে পারছে না সে। ওটা কি তারই প্রতিবিম্ব!

মেঝের ওপর স্বচ্ছ জলের ধারায় ভিজে যাচ্ছে তার পায়ের চটির চারপাশ। টোডা অপারেশন টেবিলের ধারে বন্দিটির পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। তাকে কি অন্যরকম লাগছে দেখতে? সে কেন নিজেকে মেলাতে পারছে না ঘরের অন্য সকলের সাথে?

টোডা হঠাৎ নিচু গলায় সহানুভূতির সুরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

- 'এদিকে এস, সুগুরো, এখানে দাঁড়াও। আমাকে সাহায্য করবে না তুমি?'

- 'আমি পারব না, পারব না।' 

বিড়বিড় করে বলতে লাগল সুগুরো। 'আমার আরও আগেই প্রত্যাখ্যান করা উচিৎ ছিল।'

টোডা কোনো উত্তর দিল না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই। নিজের মনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে সুগুরো হাত রাখল অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজায়।

আর ঠিক তখনই নিজের জায়গা থেকে সরে এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়াল টোডা।

সোজাসুজি সুগুরোর দিকে তাকিয়ে সে বলল,

- 'যদি তুমি না চাইতে আমাদের সাথে থাকতে, তাহলে যথেষ্ট সময় ছিল। গতকাল বা আজ সকালে জানিয়ে দিলেই পারতে। কিন্তু এখন বহুদূর এসে গেছ। প্রায় অর্ধেকেরও বেশি পথ, সুগুরো। এখান থেকে ফেরা যায় না।'

- 'অর্ধেক পথ? কী বলতে চাইছ টোডা?'

- 'তুমি একই বুরুশ দিয়ে আলকাতরা লাগিয়েছ, বন্ধু। যে বুরুশটা আমরা ব্যবহার করেছি, এখন সেটাই তোমার হাতে।'

টোডা শান্ত হয়ে  স্পষ্ট স্বরে বলল,

- 'এর থেকে কোনো পরিত্রাণ নেই। আমাদের কারুরই নেই।'

 

 

 

 

 

 

 

 সুসাকু এনডো (১৯২৩-১৯৯৬)।

লেখক পরিচিতি - সুসাকু এনডো জন্মগ্রহণ করেন টোকিওতে। জাপানে তখন রাজতন্ত্র। রাজতন্ত্রী জাপানের কিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরাসি সাহিত্যে স্নাতক হবার পর, তিনি ১৯৫০ সালে ফ্রান্সের লিঁও ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র হিসেবে যোগদান করেন। মাঝখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তার পড়াশোনায় ছেদ পড়েছিল, এবং সেই সময় তিনি এক জাপানি অস্ত্র তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। এনডো ছিলেন ফ্রান্সের প্রথম জাপানি ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। লিঁও ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন তিনি ফরাসী ক্যাথলিক সাহিত্যিকদের দ্বারা প্রভাবিত হন, এবিং ক্যাথোলিসিজম পরবর্তীকালে তার লেখার অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ফ্রান্স থেকে ফিরে আসার অব্যবহিত পরেই এনডো সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তার অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস হল - সাইলেন্স (১৯৬৬)। প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক মার্টিন স্করসেসে ২০১৬ সালে এই বইটইর উপর নির্ভর করে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। জীবৎকালে সুসাকু এনডো অসংখ্য পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আকুতাগাওয়া পুরষ্কার (১৯৫৪, সিরই হিতো বইটির জন্য) এবং অর্ডার অফ কালচার (১৯৯৫)। ১৯৯৪ সালে নোবেল সাহিত্য পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন পেলেও  তাকে শেষ পর্যন্ত সেই সম্মানে ভূষিত করা হয় নি। ব্যক্তিগত বিশ্বাসে ক্যাথলিক, সুসাকু এনডোকে পোপ ষষ্ঠ পল, অর্ডার অফ সেন্ট সিলভেস্টারের সদস্য মনোনীত করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে টোকিও শহরে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে সুসাকু এনডোর মৃত্যু হয়।        

0 Comments
Leave a reply