আধুনিক বিশ্বে দুটি বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় কঙ্গোযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আর এই আমেরিকা ইজরায়েল বনাম ইরান যু্দ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মানুষ যুদ্ধের ভয়াবহতাকে ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছে । যদিও যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিপরীতে থাকা শান্তির প্রতিই যথার্থভাবেই মানুষের আকর্ষণ। কিন্তু কে দেবে তাকে শান্তি যখন যুদ্ধই প্রতিবার লিখে চলেছে শান্তির সংজ্ঞা ! শান্তি কখনো সমঝোতা, কখনো চুক্তি ইত্যাদি। জর্জ বুশ বলেছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার জন্যই তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আর ট্রাম্প তো নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার লক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে এবং নানা দেশে যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি করার কাজেই অস্থির হয়ে রয়েছে।
যুদ্ধের কিছু প্রকারভেদও রয়েছে, যেমন বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War), প্রক্সিযুদ্ধ এমনকি জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ শব্দটিকে জুড়েও আমরা জীবনযুদ্ধ কথাটা বলতে অভ্যস্ত। প্রতিটির কার্যকারণ পটভূমি প্রেক্ষাপট যদিও আলাদা। মানবসভ্যতার দিকে তাকিয়ে আৎকে উঠতে হয়, তাহলে যুদ্ধ কি মানবজীবনে অনিবার্য একটা অভিশাপ ! অধুনা এই পৃথিবী বাজারে যুদ্ধও একটি ব্যবসাই। বর্তমান পৃথিবীতে ডিপ-স্টেটের স্বার্থ, ক্ষমতাশালী দেশগুলোর প্রভাব বা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম, সম্পদ লুন্ঠন, ধর্মের বিভেদ মূলত মিলেমিশে থাকছে যুদ্ধের কারণ হয়ে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে পারবে না। কিন্তু আমেরিকা সহ যে আটটি দেশ পরমাণু বোমা বানিয়েছে তারা কোন বিশেষ আশীর্বাদি অধিকারে এই কাজ করেছে ? একথা ঠিক আমেরিকাই এই সমস্যার মূলে। আমেরিকাই পরমাণু বোমের শ্রীবৃদ্ধিতে ইন্ধন যুগিয়েছে। আত্মরক্ষার্থে বাকি দেশগুলো গোপনে পরমাণু বোমা তৈরীতে অনেকটা বাধ্য হয়েছে। পৃথিবীর মানচিত্রে আমেরিকা না থাকলে কি যুদ্ধ লুপ্ত হয়ে যাবে ? উত্তর তো জানাই-- না। তখন অন্য কেউ আমেরিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। বিপ্লবী সাম্যবাদের নামেও যে সর্বোগ্রাসী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা কায়েম হয় তার থেকে শান্তি আশা করাও অবাস্তব। বিংশ শতাব্দিতে ‘Superior Race’ তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন হিটলার। বর্তমানে দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের হুজুগ উঠেছে। রেডিমেড ও প্রি-ফেব্রিকেটেড মনন দিয়ে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া যাবে না। আবার পুঁজিবাদী দুনিয়ার কল্যানে তথ্য, তত্ত্ব, বিনোদন, যোগাযোগ, স্ফূর্তির অবিশ্রান্ত অভিঘাতে মানুষের জীবন বৈশিষ্টহীন, বিচ্ছিন্ন ও হতশ্রী হয়ে উঠেছে। একেও কি যুদ্ধ বলবো না ? বানিজ্যিক স্বার্থে, মুনাফার লোভে বিউটি মিথের মধ্যদিয়ে সিন্থেটিক বা হাইব্রিড মহিলা-পুরুষের যোগান দিতে দিতে মানুষের জীবনকে নরক করে দেওয়া কি সুস্থ জীবনের বিরুদ্ধে একপ্রকারের যুদ্ধ নয় ?
বুদ্ধ শান্তির কথা বলেছেন কিন্তু তাঁর কিছু প্রকৃত অনুগামী ছাড়া আর কেই বা শুনেছে। বরং ব্যক্তি-জীবন থেকে রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় হিংসাই প্রাধান্য পেয়েছে। ‘যার লাঠি তারই মাটি’ তত্ত্বই প্রাধান্য পেয়েছে। প্রাধান্য পেয়েছে অধিকারবোধ। যেহেতু ঘৃণা, হিংসা মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সে কারনেই ধর্ম, বর্ণ আরো নানারকম বিষয়ে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা সহজ। বামিয়ান বুদ্ধ ধ্বংস তো প্রতীকি। বুদ্ধের শান্তির বাণীকে আমরা তো ধ্বংশ করে চলেছি স্মরণাতীত সময় থেকেই। সভ্যতার নামে প্রকৃতি-কে ধ্বংস করার সর্বগ্রাসী মহযজ্ঞ চলছেই তাও তো যুদ্ধই। সমস্ত যুদ্ধেই মানবতার পরাজয় সংগঠিত হয়েছে। যদিও ক্ষয়,ক্ষতি, মৃত্যু, ধ্বংসলীলা সত্ত্বেও সব যুদ্ধকে এক বলা যায় না, যেমন ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইত্যাদি। যেমন যুদ্ধই হোক না কেন তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না ? এই স্নায়ুবিদারক প্রশ্নের সামনে এখন শুধু নিথর হয়ে থাকতে হয়।
মানুষের ইতিহাসে হিংসা ও অহিংসা এই দুই শক্তিই ছিল আর তাদের অবিরাম সংগ্রাম আজও চলেছে। যদিও রাষ্ট্রের ক্ষমতা দিনে দিনে এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে ব্যক্তি মানুষের পরিসরটা খুবই নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্র ক্ষমতাগুলো যেন পাশা খেলছে মানুষের ভাগ্য নিয়ে। যুদ্ধে রাসায়নিক, পারমাণবিক এবং জৈবিক অস্ত্র ব্যবহার করে বেসামরিক জনগণকে নির্দ্ধিধায় ধ্বংস করে দেওয়া যেন খুবই সাধারণ ও অনিবার্য ব্যাপার। আমরা বৃহৎমানবসমাজ, যুদ্ধে আমরা আমাদের স্বজনকেই হারাই। খন্ড খন্ড গোষ্ঠী অথবা রাষ্ট্র যখন কেবল নিজের গোষ্ঠীকেই সুরক্ষিত রাখতে ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে অন্য গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার নামিয়ে আনে তখন মানবতা রক্তাক্ত হয়। জাতি ও সাম্রাজ্যের ভেদরেখা থাকলে যুদ্ধও থাকবে। সমস্যা হল আদর্শের সে শক্তি নেই যা দিয়ে হিংসা/ যুদ্ধ রোধ করা যায়। আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে বা টিকিয়ে রাখতেও যে হিংসার আশ্রয়ই নেওয়া হয় !
গ্রিকেরা যুদ্ধের ভেতর থেকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ তৈরি করেছিলেন। যুদ্ধের নিয়ম-কানুন রচনা করেছিল। যদিও তারা এই আদর্শের প্রতি অটল থাকতে চায়নি ও পারেনি। আজও আমরা দেখি রাষ্ট্রসংঘে কাদের নিয়োগ করা হয়, যারা মূলত মার্কিনিদের তাঁবেদার। তারা পক্ষপাতদুষ্ট বিবেকের ভূমিকা পালন করে চলে। মানব ইতিহাসে যুদ্ধ দুরকম ভূমিকা নিয়েছে, যেমন, মোঙ্গল আর তুর্কিদের যুদ্ধ ভয়ংকর শোচনীয় অবস্থা সৃষ্টি করেছিল, অন্যদিকে ফ্রান্সের রাজার সম্পদ লালসার কারণে রোমান সাম্রাজ্যর সৃষ্টি হয়েছিল। এই নতুন ফ্রান্স ছিল ঐক্যবদ্ধ ও শান্ত। অদ্ভুত হলেও সত্যি যে কখনও যুদ্ধই শান্তির কারণ হতে পারে। যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্য বড়ো হয় এবং ওই সব সাম্রাজ্যের চারপাশের ক্ষমতাবান কেন্দ্রীয় শাসনের কারণেই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এই শান্তি আবার দীর্ঘস্থায়ী হয় না, বড়ো সাম্রাজ্যেরও বড়ো হবার একটা সীমা থাকে, ছোটো ছোট অনেক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত হয়, কখনো গৃহযুদ্ধের আকার নেয় ,তাছারাও, নানা কারণে বড়ো সাম্রাজ্যেরও পতন হয়। এখন কি ভাবা সম্ভব সার্বভৌম আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রের কথা ? তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
