সুকান্ত - আজও প্রেরণা

লিখেছেন:বৈদ্যনাথ সেনগুপ্ত

কবি সুকান্ত! কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। অকালে প্রয়াত এই বিস্ময় প্রতিভাকে এই শতবর্ষে ও স্মরণ করা হয়। সে কতখানি প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে আলোচনা চলে। মাত্র ২১ বছর বেঁচে ছিলেন। জন্ম ১৫ ই আগস্ট ১৯২৬ আর প্রয়াত হয়েছেন ১৩ই মে ১৯৪৬। অনেক কবিতা লিখেছেন তিনি মানে ওই একটুকু বয়সের নিরিখে অনেক তো অবশ্যই। তাঁর অনেকগুলি কবিতার বই বেরিয়েছিল কিন্তু সবকটাই তাঁর মৃত্যুর পরে। বস্তুতপক্ষে এত জনপ্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বাদ দিয়ে খুব কমই বাংলা কবিতা জগতে রয়েছে। তাঁর সুহৃদ অনুগামীরা তার কমরেড রা দায়িত্ব নিয়ে ভালোবাসা নিয়ে বইগুলি ছেপেছেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল ছাড়পত্র (এটি প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৪৭)। এছাড়া পূর্বাভাস (১৯৫০) মিঠে কড়া (১৯৫১) অভিযান (১৯৫৩) ঘুম নেই (১৯৫৪) হরতাল (১৯৬২) গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫)। পরবর্তী সময়ে তার সমস্ত কবিতা ও রচনা নিয়ে সুকান্ত সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। 

সুকান্তর কবিতায় উঠে এসেছে নিপীড়িত মানুষের কথা। ব্যক্তি জীবনে তিনি সাম্যবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, শুধু বিশ্বাসী ছিলেন তাই নয় তাঁর ব্যবহারিক জীবনে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সাম্যবাদী চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি অন্তর থেকে বিশ্বাস করতেন সমাজ পরিবর্তনের কথা, স্বপ্ন দেখতেন শোষণহীন সমাজের আর তারই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর লেখা পত্রে। সুকান্ত যখন বড় হচ্ছেন  বেড়ে উঠছেন তখন গোটা বিশ্ব জুড়ে চলছে অস্থিরতা। একদিকে যুদ্ধের উন্মাদনা অন্যদিকে মানব মুক্তির সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্র, সুকান্তর জন্মের কিছু আগে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব এবং তার রেশ এসব কিছুই তৎকালীন দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য। এই দুনিয়াতেই সুকান্ত বড় হয়েছেন সাম্যবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাঁর কবিতার মধ্যে এসবের প্রতিফলন ঘটেছে। একজন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণের লেখন শৈলী কতটা পাঠক গ্রহণ করবে তা অবশ্যই পাঠকের উপর নির্ভর করবে কিন্তু মনে রাখতে হবে সুকান্ত যে সময় কবিতা লিখেছেন বাঙালি তখন রবীন্দ্রনাথকে পেয়ে গিয়েছে একেবারে নিবিড়ভাবে,সাথে রয়েছেন নজরুল দ্বিজেন্দ্রলাল রজনীকান্ত সহ আরো অনেকে। তবুও ভাবতে অবাক লাগে এত উজ্জ্বল প্রতিভার মধ্যে কি করে একজন তরুণ কবি স্বকীয়তা বজায় রেখে কাল জয়ী হয়ে উঠলেন। এতটাই কাল জয়ী যে জন্মশতবর্ষে আজও তিনি প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছেন।                     

"ইচ্ছা হয়, কটি সৎ কবি লেখক এর নাম করি। (সাম্প্রতিক সাহিত্য কবিতা আর পড়ি বা না পড়ি, কানে আসে এরা সব মালিকানা শর্তের খাতিরে যথেষ্ট দায়িত্বহীন)। মানিক, জীবনানন্দ দাশ আজ নেই, বাকি যাঁরা ম্রিয়মাণ নিজেরই গভীরে অথচ একটি নাম বাঙলার উজ্জ্বল ইতিহাস। সমস্ত সমাজে কাঁপে যুদ্ধরত মানুষের নিঃশ্বাস। বন্ধুগণ সাড়া দিন, এখনো আসুন এই উদ্বেল তিমিরে। সুকান্ত আপনার কথা, মনে পড়ে" - অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়। এমনটাই ছিলেন সুকান্ত চেতনা, প্রেরণা। তাঁর সাহস, মেধা, নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা দিয়ে অন্যকে অনুপ্রাণিত করতেন শুধু সমসাময়িক বন্ধুদেরই নয় উদ্বুদ্ধ করতেন অগ্রজ কবি কমরেডদেরও। তাঁর মৃত্যুর পরে, অনেক পরেও তাঁর বন্ধু-বান্ধবেরা, অগ্রজ কবি সাহিত্যিকরা শ্রদ্ধা ভালবাসার সাথে তাঁকে স্মরণ করেছেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট মতবাদে বিশ্বাস করতেন কিন্তু তাঁর মতাদর্শের বিরোধীরাও তাঁর রচনার গুণাবলী সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এখানেও সুকান্তর কবি জীবনের সার্থকতা।সুকান্ত সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতেন। রাজনীতি করতেন ঘরে বসে নয় রীতিমতো মাঠে ময়দানে নেমে। পার্টির পত্রিকা ফেরি ও করতেন তিনি। কমিউনিস্ট পার্টি করাটা খুব সহজ ছিল না এবং এই কাজটা উনি করতেন এক কঠিন অসুখকে বুকে বয়ে নিয়ে। মৃত্যুর আগে অসহ্য যন্ত্রণা পেয়েছিলেন তিনি। বাংলা কবিতার তথা সাহিত্যের দুই অবিস্মরণীয় যোদ্ধা নজরুল এবং সুকান্ত তাঁদের সবটুকু দিয়ে যেতে পারেননি। নজরুল বাকশক্তি হারিয়েছিলেন দীর্ঘকাল, সুকান্ত অকালে প্রয়াত। এ আমাদের বড় ক্ষতি। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, "সুকান্ত একদিন এলো আমার কাছে। কালো কালো শক্ত পোক্ত চেহারা ছোট করে ছাটা চুল আধ ময়লা মোটা জামা কাপড়, পায়ে (খুব সম্ভব) জুতো নেই। তার বড় বড় মজবুত হাত পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে হলো তার রক্তের আত্মীয়তা সেই কৃষক মজুরেরই সাথে যাদের কথা লিখতে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গোর্কির মত তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।"

উপরের লেখাটা সুকান্ত সম্পর্কে হলেও খুব ব্যাতিক্রমী নয় কিন্তু। তখন কমিউনিস্ট পার্টি করাটা খুব সৌখিন মজদুরি ছিল না অনেক ঝুঁকি নিয়েই করতে হতো। তখন মধ্যবিত্ত ঘরের বা নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা (তখন রাজনীতিতে মেয়েরা সরাসরি আসতেন খুব কম) কমিউনিস্ট পার্টিতে আসতেন বা কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের জীবন বেছে নিতেন তাদের প্রায় সবারই গঠন অবয়ব অনেকটা একই রকম ছিল। সেখানে সুকান্ত হয়তো খুব অসাধারণ ছিলেন না, তাঁর অসাধারণত্ব বা তাঁর স্বকীয়তা ছিল তাঁর সাহিত্যকর্মে, বিশেষত তাঁর কবিতায়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, তিনি তার গণসংগঠন কিশোর বাহিনীর নেতৃত্ব দায়ী সংগঠক ছিলেন তার জন্য ইতিহাস তাঁকে মনে রাখেনি বা রাখত না, ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে তাঁর লেখনী র জন্য বিশেষত তাঁর কবিতা গুলির জন্য। ওই অল্প বয়সেই কি করে একজন অমন কবিতা লিখতে পারে তা সত্যিই গবেষণার বিষয়। রানার, ঠিকানা, অবাক পৃথিবীর মতো কবিতাগুলি উপযুক্ত সুরকার এবং গীতিকারের দৌলতে অন্য জগতে আমাদের পৌঁছে দেয় কিন্তু একথা অনস্বীকার্য এসব গুলিই পরিণত জীবন বোধের প্রতিচ্ছবি। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে উপনিবেশিকতার অভিশাপ, পরাধীনতার যন্ত্রণা, মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতা আবার ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিভীষিকা। বিপরীতে উঠে এসেছে এর থেকে পরিত্রাণের আকাঙ্ক্ষা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সেগুলি উঠে এসেছে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে অথচ কাব্যের। সাবলীলতায়। সুকান্তর অনেক কবিতাই কাল জয়ী হয়েছে, অনেকগুলি লাইন তো প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছেপূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি অথবা তাই আজ আমারও বিশ্বাস / শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস / তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে / দানবের সাথে সংগ্রামের তরে। মানুষ আজ চাঁদে পৌঁছে গিয়েছে, হয়তোবা চাঁদের জগত ছেড়ে তার গতিবিধি আরো অন্যত্র তবুও আজও এই দুনিয়ায় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। 

সুকান্ত তাঁর কোন সংকলন ছাপার অক্ষরে দেখে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র প্রকাশিত হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন। মৃত্যুর পরে অনেকেই সুকান্তর কবিতা, লেখা, জীবনযাত্রা নিয়ে আলোচনা করেছেন, কেউ তাঁকে রবীন্দ্রনাথের সাথে তুলনা করতে চেয়েছেন আবার কেউবা তার লেখায় স্থূলতার প্রলেপ দেখতে পেয়েছেন। গঙ্গোপাধ্যায়ের মত বিশিষ্ট সাহিত্যিকও এক জায়গায় লিখেছেন, কবিতার রহস্যময়তা, শব্দের ধ্বনি মাধুর্য,যে কারণে একটি ছোট কবিতাও অনেকক্ষণ ধরে বা বহু বছর ধরে মনের মধ্যে তরঙ্গ তুলে যায়, সুকান্তর কবিতায় সেই গুণগুলি অনুপস্থিত।"কথাগুলো ভুল প্রমাণ করে আজও কিন্তু সুকান্তর কবিতা স্বমহিমায় বিরাজ করছে। এখনো ‘জেনজি’র আন্দোলনে ক্যাপশন দেওয়া হয়,এদেশের বুকে আঠেরো আসুক নেমে।  সুকান্ত স্বল্পায়ু ছিলেন। তিনি স্বাধীন ভারত দেখে যেতে পারেননি, তেভাগা আন্দোলন তাঁর জীবদ্দশায় শুরু হয়েছে, তেলেঙ্গানা নকশালবাড়ি দেখেননি কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙ্গন বহুধা বিভক্তিও দেখেননি। বেঁচে থাকলে তিনি এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কোন ধারায় যুক্ত থাকতেন বা আদৌ কমিউনিজমের উপরে তাঁর আস্থা থাকতো কিনা সে গবেষণা নিরর্থক। তবে প্রতিটি কমিউনিস্ট পার্টি বা গোষ্ঠী তাঁর উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে যাবার অঙ্গীকার করে এটাও সুকান্তর লেখনীর এক সার্থকতা।একজন তরুণ কবির সীমাবদ্ধতা থাকবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ পাঠকের কাছে সুকান্তর কবিতা সীমাবদ্ধ মনে হয়নি বরং বেশিরভাগ কবিতায় মানুষের কথা বলেছে মুক্তির দিশা দেখতে চেয়েছে। তাঁর কবিতার অসাধারণ লাইন, ‘এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’, আজও মুক্তিকামী মানুষের দিশা।

 

0 Comments
Leave a reply