আমি যখন জন্মালাম,এই প্রাচীন সুগন্ধির দেশটা ছিল ঠিক লফটের ওপর তুলে রাখা পুরনো দাদির আমলের আতরের বোতলের মতো। ঢাকনা খুললে ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে লাগে, কিন্তু বোঝা যায় না এটা দিয়ে শরীরচর্চা হবে না কি মৃতদেহ সৎকার। বিপ্লব তখন জাস্ট —ফ্রেশ আউট অফ ওভেন। লোকে বলাবলি করছে—ব্রো, পৃথিবী বদলে গেছে!
আমি পারভিজ। নামটা শুনে খুব বেশি ইমপ্রেসড হওয়ার দরকার নেই। চন্দ্রবালক শায়রদের মতো কোনো দার্শনিক আলো আমার কপাল থেকে বেরোয় না। আবার মাসালাপুরের রাস্তার চায়ের দোকানের সস্তা গালিগালাজও বা খাঁটি খিস্তিখেউড়ও আমার ভাষা পুরোপুরি না। আমি মাঝামাঝি একটা ক্যারেক্টার। মানে, একেবারে মিডল আপডেট ভার্সন। জীবনটা মাঝে মাঝে এমন লাগে—সফটওয়্যার ইনস্টল হয়েছে, কিন্তু অপারেটিং সিস্টেম ফুল লোড নেয়নি। পুরো ব্রেন গ্লিচ, জান!
এই ডায়েরিটা লিখছি ছাব্বিশ সালের মার্চ মাসে। আমি একটা বাঙ্কারে বসে আছি। ওপরে মাঝে মাঝে সাইরেন বাজছে। শব্দটা এমন, যেন আকাশ থেকে কেউ একটা মরচে ধরা বাঁশি বাজাচ্ছে আর বলছে—খোদা হাফেজ, পৃথিবী।
আমার সামনে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে যার আলোটা হলুদ, হালকা, হাহাকারমাখা। আলো দেখলে মনে হয়— পৃথিবীর লাস্ট চ্যাপটারের আগের অনুচ্ছেদ লিখছি আমি।
আপনি যদি ভাবেন আমি কোনো মহাবিপ্লবী, কোনো জিও পলিটিক্যাল গুরু, তাহলে একটু থামুন। এক কাপ চা খান। কারণ আমি আসলে একেবারে সাধারণ মানুষ— পেট চালানো চেতনাহীন চা-ওয়ালা। মাঝে মাঝে মনটা মেটাফিজিক্সে মেশে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় জীবনটা লাগে—ডেল্যুলু। অবশ্য মাসালাপুরে চা-ওয়ালাদের জিও পলিটিক্যাল গুরু হতে কোনও বাধা নেই— মা শা আল্লাহ।
আমার জন্ম আটের দশকে। তখন দেশটার গায়ে ছিল আতরের অদ্ভুত আবেশ। গোলাপের গন্ধ,গুজবের গুঞ্জনের ফাঁকে ফাঁকে তখন বিপ্লবী স্লোগানের স্রোত— ইনকলাব, ইনকলাব।
আমার কাছে বিপ্লব মানে ছিল বাবার দর্জির দোকানের ডিজাইন বদলানো।
আগে বাবা মিনিস্কার্ট বানাতেন। দোকানের নাম ছিল —মডার্ন লেডিস ফ্যাশন হাউস। দরজার সামনে পোস্টার—নীল চোখের নরম নায়িকা, হাঁটু পর্যন্ত কাপড়,আর বাবার মুখে মৃদু মুচকি হাসি। তিনি বলতেন—ফ্যাশন মানে ফ্রি ফিলিং, বেটা!
তারপর বিপ্লব হলো।
একদিন সকালে দোকানে গিয়ে দেখি সাইনবোর্ড বদলে গেছে। নতুন নাম— আল-হালাল পোশাক কেন্দ্র।
মিনিস্কার্ট মুছে গেল। বোরখা বসে গেল।
কিন্তু একটা মজার মুশকিল ছিল। বাবার হাতের অভ্যাস, মাসল মেমোরি।
তিনি এতদিন মিনিস্কার্ট বানিয়েছেন যে মাঝে মাঝে বোরখার নিচেও চুপচাপ একটা চেরা ব্যবস্থা দিয়ে ফেলতেন। একদিন এক মহিলা এসে চিৎকার করে বললেন—এটা কী বানিয়েছ?
বাবা বললেন—ডিজাইন, জান। এয়ার সার্কুলেশন।
সেদিন আমি বুঝলাম— বিপ্লব মানুষের মন বদলায় না। শুধু মাপ বদলায়, মডেল বদলায়,কিন্তু দর্জির হাতের কবজির মোচড়টা একই থাকে।
স্কুলে তখন নতুন নতুন নিয়ম। নতুন বিষয়—জাতীয় গিট বাঁধন শিক্ষা।
মোয়াল্লিম মানে স্যর এসে শেখাতেন কীভাবে নীল চোখো সওদাগরদের পতাকায় শক্ত করে পাটের দড়ি দিয়ে এমন গিট দিতে হয় যাতে ওটা উড়তে গিয়ে মাঝপথে লটকে যায়। মোয়াল্লিম বলতেন—এই গিটটাই হলো আমাদের দেশের ইগো।
আমি একদিন হাত তুলে বললাম—স্যর, গিট তো দিলাম, কিন্তু লাঞ্চে তো শুধু শুকনো রুটি আর জল। গিট দিয়ে কি ভাল কিছু খেতে টেতে পাবো পেটপুরে?
মোয়াল্লিম কিছুক্ষণ আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি কোনো এলিয়েন। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন—
পারভিজ, তোমার কোশ্চেনিং স্কিল খুব হাই। ভবিষ্যতে তুমি হয় শায়ের হবে, নয়তো জেন্দানি(কারাবন্দী)। তোমার কপালে কোনো মিডল গ্রাউন্ড নেই।
সেদিন বুঝেছিলাম, এই পৃথিবীতে সওয়াল করাটা হলো সবচাইতে বড় আনসেফ অ্যাক্ট। তবু ডায়েরিতে লিখে রাখছি—বিপ্লবের পর মানুষ ভাত বেশি পায় না, পায় শুধু নতুন নতুন মেটাফর আর কড়া কড়া স্লোগান। স্লোগান দিয়ে পেট ভরে না বস্, শুধু গলা শুকিয়ে কাঠ হয়। আর সেই শুকনো গলায় আমরা আবার নতুন করে ইনকলাব বলে চেল্লাই। পুরো সিচ্যুয়েশনটাই একটা অন্তহীন ল্যুপ।
নব্বই দশকে আমাদের দেশে একজন লোক এলেন। সবাই তাকে আদর করে ডাকত ‘নরমপন্থী মেষপালক’। তিনি এসে বললেন: চিল ব্রো! আমরা এখন থেকে ওয়ার্ল্ডের সাথে কানেক্ট হব। ডায়ালগ হবে, কোলাকুলি হবে, এমনকি উইকেন্ডে জ্যাজ মিউজিকও চললে চলতে পারে।
গোটা দেশ তখন খুশিতে ডগমগ,শুরু হলো কূটনৈতিক কোলাহল। করমর্দন,কোলাকুলি,ক্যামেরার কৃত্রিম করুণা।
কিন্তু আমি জানি—এসব সংস্কার হলো আসলে পলিটিক্যাল ফেস মাস্ক। শিয়াসত বা পলিটিক্স হলো একটা বড়সড় লন্ড্রি শপ। সবাই নিজের ডার্টি লন্ড্রি ধোয়, কিন্তু জলটা সেই একই ড্রেনে যায়।
নতুন শতকের শুরুর দিক। আমি তখন নতুন নতুন ইন্টারনেট ডিসকভার করেছি। ওই যে ফোন লাইনে কানেক্ট করলে খটর খটর আওয়াজ হতো, মনে হতো যেন কোনো রোবট প্রেগন্যান্ট হয়ে গোঙাচ্ছে। চ্যাটরুমে গিয়ে আমার সাথে পরিচয় হলো এক মেয়ের। নাম তার—পার্সিয়ান রোজ। সে বলত সে থাকে ‘দেওয়াল ঘেরা বাগানে’ (যেখানে নাকি সব কিছুতেই সেন্সর বসানো)।
রোজ লিখত, পারভেজ, তোমার প্রোফাইল পিকচারটা তো পুরো ভিন্টেজ ভাইব। তুমি কি জানো, মরুভূমির রাতে তারারা কত কাছে থাকে?
আমি ভাবলাম, বাহ! এই তো জন্নত। আমি কবিতা লিখলাম, সে আমাকে ইমোজি পাঠাল। তিন মাস পর আমি যখন তাকে বললাম: চলো ভিডিও কলে আসি, তখন সে একটা কোড পাঠাল।
পরে আমার এক হ্যাকার বন্ধু বলল—আরে গোর- ই-খার ( জংলি গাধা), এটা কোনো মেয়ে না। এটা হলো অদৃশ্য ছায়াশিকারীদের পাঠানো একটা 'বট'। তোর সব ডেটা নিয়ে পালিয়েছে।
আমি বুঝলাম,
এই রিলেশনশিপ আর ইনভেস্টিগেশন—দুটোই আসলে একই জিনিস। শেষে গিয়ে আপনি জানতে পারবেন আপনি একটা গাভ্দি ( গরু) !
এদিকে ইন্টারন্যাশনালি আমাদের ব্র্যান্ডিং হয়ে গেল—অ্যাক্সিস অফ ইভিল বা শয়তানের আস্তানা। নীল চোখের সওদাগররা টিভিতে বড় বড় লেকচার দিল আমাদের নিয়ে। আমি শুনে টাশকি খেলাম। ভাই, শয়তান হতে গেলে তো প্রচুর ডিসিপ্লিন লাগে, অনেক এনার্জি লাগে। আমরা তো দুপুরবেলা তিন প্লেট পোলাও পেদিয়ে পাঁচ ঘণ্টা ঘোড়া-ঘাস কাটি আর ইনডোর গেম খেলি। আমরা শয়তান হতে যাব কোন দুঃখে? আমাদের অত মোটিভেশনই নেই!
লাস্ট ডেকেডে খেলা ঘুরে গেল। আমাদের দেশ ঠিক করল আমরা বানাব পারমাণবিক কেটলি। সরকার বলল: এটা দিয়ে আমরা ইউরেনিয়াম থেকে এনার্জি বানাব।
আমি তখন সরকারি প্রোপাগান্ডা অফিসের টি-বয়। বড় বড় মেজো-সেজো অফিসারদের চা দিতাম। ল্যাবে গিয়ে একদিন উঁকি মারলাম। সায়েন্টিস্টরা বড় বড় সব ইকুয়েশন লিখছেন। আমি চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলাম—ওস্তাদ! এই মেশিনটা দেখতে তো একদম আমাদের সেই পুরনো প্রেসার কুকারের মতো, যেটায় আব্বাজান গোস্ত রান্না করেন।
সায়েন্টিস্ট চশমাটা নাকে তুলে বললেন—পারভিজ, এটাই হলো মডার্ন সায়েন্স। এটাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিশন। যদি ঠিকঠাক ফাটে, তাহলে গোটা দেশের ইলেকট্রিসিটি ফ্রি হবে।
আমি বললাম—আর যদি ভুল করে ফাটে?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—তাহলে আমরা সবাই তারিখী জাভেদন ( ইতিহাসে অমর) হয়ে যাব। ফটো হয়ে দেয়ালে ঝুলব।
এই সময় হরেক মালের কারবারি মাসালাপুর থেকে লোকজন আসত। তারা আমাদের দেশ থেকে সস্তায় তেল নিত, আর আমাদের গালিচা কিনে নিজেদের ড্রয়িংরুমে সাজাত। তারপর লোকগুলো নীল চোখের সওদাগরদের সাথে ডিনার করত আর আমাদের নামে একটু নুন-ঝাল মাখানো গসিপ করত।
একবার এক মশলাপুরের ব্যবসায়ীকে বললাম—আপনারা তো আমাদের বন্ধু,না কি সওদাগরদের এজেন্ট?
তিনি হেসে বললেন: পারভিজ ভাই, এটাকে বলে 'মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট'। আমরা আসলে সবারই বন্ধু, আবার দিনশেষে কারোরই না। আমরা শুধু আমাদের গরম মশলার ফ্লেভার ঠিক রাখতে জানি।
আমি বুঝলাম,এই পৃথিবীতে কেউ কারো পার্মানেন্ট লভ-ইন্টারেস্ট নয়, সবাই শুধু সিচ্যুয়েশনশিপে আছে।
বছর দুয়েক আগে খবর এল, ভল্লুকের আস্তানা খেরস্ কেশভার বিপদে পড়েছে। তাদের কাছে হাতিয়ার কম। আমাদের দেশ বলল—ডোন্ট ওয়ারি ব্রো, আমরা ড্রোন পাঠাচ্ছি।
আমি সেই ড্রোন কারখানায় কাজ করার চান্স পেলাম। গিয়ে দেখলাম ইনসাইড স্টোরিটা কী। ড্রোনগুলোর ইঞ্জিনগুলো আসলে পুরনো দিনের মিক্সার গ্রাইন্ডারের ব্যাটারিতে চলে। যখন সেই ড্রোনগুলো শত্রুর আকাশে ওড়ে, তখন আওয়াজ হয়— ব্জ্জ্জ্জ্জ্জ্জ...। ঠিক যেন একঝাঁক রাগী মশা কানের কাছে গান গেয়ে কান পচিয়ে দিচ্ছে।
শত্রুরা কনফিউজড। ড্রোনটা ফাটবে কি ফাটবে না সেটা সেকেন্ডারি, কিন্তু ওই বিশ্রী আওয়াজে তাদের নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়ে যাচ্ছে। ড্রোনটার নাম দেওয়া হলো— যানবর হাফেজ সালেহ বা শান্তির মৌমাছি। ভল্লুকরা হেভি খুশি, কারণ আমাদের ড্রোনগুলো সস্তা আর টেকসই। আমি ভাবলাম, যুদ্ধ আসলে এখন আর বীরত্বের ব্যাপার না, এটা হলো স্রেফ একটা সিম্যুলেশন গেম— যার কাছে যত বেশি ব্যাটারি প্যাক আছে, সে-ই রাজা।
আমি এখন এই সুগন্ধি শহরের একটা বাঙ্কারে বসে ডায়েরি লিখছি। বাইরের আকাশটা এখন পুরো পিংক আর অরেঞ্জ হয়ে গেছে। না, কোনো রোম্যান্টিক সানসেট না—ওটা আসলে ওই দেওয়াল ঘেরা বাগানের পাঠানো মিসাইলের ধোঁয়া।
আজ সকালে আমার জানলার পাশে একটা মিসাইল ল্যান্ড করল। ফাটল না। আমি ভয়ে ভয়ে গিয়ে দেখলাম গায়ে একটা স্ক্র্যাচ পড়েছে। ওটার গায়ের লোগোটা দেখে মনে হলো ওটা কোনো একটা নামী কসমেটিকস কোম্পানির স্পনসরড কি না! আমি ওটা চ্যাংদোলা করে ভেতরে নিয়ে এসেছি। এখন সেই মিসাইলটার ভোঁতা দিকটা দিয়ে আমি আদা-রসুন পিষছি।
লোহা তো লোহাই, ভাই। তা সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসুক আর রান্নাঘর থেকে। এটাকে বলে রিসোর্সফুল নিহিলিজ্যম। ইন্টারনেটে একজন ফিলোজ্যফার এমনটাই বলেছেন।
টিভিতে আমাদের বর্তমান রুলার, যার নাম দ্য গ্রেট ফিলোজ্যফার অফ সাইলেন্স, তিনি গম্ভীর গলায় বলছেন—আমরা অলরেডি জিতে গেছি। আমাদের আকাশ এখন পিক্সেল-মুক্ত।
আমি আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম। পুরো ফ্যাকাশে। চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল। আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম: পারভিজ, জেতা মুখ কি এত কুৎসিত হয়? নাকি আমাদের লিভার পচে যাচ্ছে?
বাইরে সাইরেন বাজছে। ড্রোনগুলো এখন আর গান গাইছে না,চিৎকার করছে। আমার কলম থেকে কালি শেষ হয়ে আসছে। কালি না কি রক্ত—আমি ডিফারেন্সিয়েট করতে পারছি না।
আমি এখন বাঙ্কার থেকে বেরোচ্ছি। না, আমি কোনো সুইসাইড মিশন বা বীরত্ব দেখাতে বেরোচ্ছি না। আসলে পাশের বাড়ির যে ড্রোন অপারেটর ছেলেটা আছে, সে ভুল করে একটা ডেলিভারি ড্রোন পাঠিয়েছে আমার ছাদে। তাতে এক প্যাকেট গরম বিরিয়ানি আছে।
আজকের দিনে,এক প্যাকেট বিরিয়ানিই হলো সবচাইতে বড় রেভোল্যুশন। শিয়াসত গোল্লায় যাক, ড্রোনগুলো আকাশে বাজি পোড়াক, আমি আগে বিরিয়ানিটা খাই।
ইনকলাবের আগে মানুষ পেট ভরে খায়, তারপর স্লোগান দেয়, আর সব শেষে গিয়ে তারিখ লেখা হয়। কিন্তু ট্র্যাজেডি হচ্ছে—তারিখ লিখতে গেলে যে কাগজ লাগে, এই মুহূর্তে সেই কাগজ দিয়ে আমরা রাস্তার মোড়ে বসে বাসি রুটি মুড়ে খাচ্ছি অর্ধেক দিন।
বিরিয়ানির প্যাকেটটা খুলতেই এক অদ্ভুত নীল রঙের ধোঁয়া বেরোল। আমি নিশ্চিত, এটা আমাদের মসালাপুর থেকে আসা কোনো এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল জাফরান। বিরিয়ানির চালগুলো ছিল একেকটা জীবন্ত পিক্সেলের মতো—চিনচিন করে নড়ছে।
আমি যখন প্রথম লোকমাটা মুখে তুললাম, হঠাৎ বাঙ্কারের ছাদটা একটা বিশাল বড় এলইডি স্ক্রিনের মত হয়ে গেল। সেখানে দেখা যাচ্ছে আমি নিজেই বিরিয়ানি খাচ্ছি, কিন্তু সেই আমিটা একটা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ভেতর আটকে আছি। এটা আর নিহিলিজ্যম নেই, এটা এখন মেটা-ভার্সাল ক্যাওস।
হঠাৎ আমার মনে হলো, আমি আসলে ভাত খাচ্ছি না—আমি খাচ্ছি আমাদের দেশের গত দশ বছরের হারিয়ে যাওয়া বিকেলের রোদ্দুর। একেকটা আলু মানে একেকটা পারমাণবিক কেটলি, যেগুলো পেটে যাওয়ার পর এক-একটা ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আমাকে অমরত্বের বদলে এক-একটা বিশাল বিশাল নফখ-ই- শিকম বা হাইড্রোজেন সালফাইড সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ ‘পাদ’।
আমি বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এখন আকাশটা আর নীল নেই, ওটা এখন একটা বিশাল এক্স-রে প্লেট। মেঘগুলোর ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর কঙ্কাল। দেওয়াল ঘেরা বাগানের ড্রোনগুলো আকাশে এখন আর মিসাইল ফেলছে না, তারা ছুড়ে দিচ্ছে বড় বড় কিউ-আর কোড।
আমি একটা কোড স্ক্যান করলাম। ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠল— অভিনন্দন পারভিজ! যুদ্ধ দেখার জন্য আপনার সাবস্ক্রিপশন আরও এক মাস বাড়ানো হয়েছে। কোনো টাকা লাগবে না, শুধু আপনার আত্মার একটা স্ক্রিনশট পাঠান।
রাস্তার মোড়ে গিয়ে দেখি এক অদ্ভুত দৃশ্য।
অদৃশ্য ছায়াশিকারীরা এখন আর অদৃশ্য নয়। তারা সবাই এখন থ্রি-ডি হলোগ্রাম হয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, আছে বড় বড় সেলফি স্টিক।
এক ছায়াশিকারী আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল—পারভিজ ভাই, একটা সেলফি হবে? আপনার ওই দাড়ি আর ছেঁড়া পাঞ্জাবিটা আমাদের ‘ভার্চুয়াল ওয়ার মিউজিয়ামের জন্য খুব দরকার।
আমি অবাক হয়ে বললাম—আপনারা তো আমাদের মারতে এসেছিলেন, তাই না?
তিনি হাসলেন। সেই হাসিতে এক হাজারটি কাঁচ ভাঙার শব্দ হলো। বললেন—আরে ওসব তো ওল্ড স্কুল। এখন যুদ্ধ মানে হলো এনগেজমেন্ট। আপনি যত বেশি কাঁদবেন, আমাদের ভিউ তত বাড়বে। আপনি মরলে আমাদের লাইভ স্ট্রিম সাকসেসফুল হবে। কাম অন, একটু ইমোশনাল ফেস করুন তো!
আমি বুঝলাম, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়, এটা হলো ডেটা দখলের উৎসব। নীল চোখের সওদাগররা এখন ড্রোন দিয়ে বোমা বার্গার খেয়ে খুব পেট ব্যথা না হলে ফেলে না, তারা ড্রোন দিয়ে হাই-স্পিড ওয়াইফাই ছড়ায়। যাতে আমরা মরার সময়ও আমাদের শেষ মুহূর্তের ভিডিওটা সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করতে পারি।
আমি দেখলাম আমাদের সেই ‘প্রাচীন মেষপালক’ শাসক আকাশে ভাসছেন। তার দাড়িটা এখন একটা বিশাল মেঘের মতো সারা শহরকে ঢেকে রেখেছে। তিনি বলছেন: ভয় পেও না পারভিজ। আমরা আসলে কেউ নেই। এই পুরো যুদ্ধটা হলো একটা বড় সাইজের ‘ভিডিও গেম’, যা পাশের গ্যালাক্সির কোনো একটা বাচ্চা ছেলে খেলছে।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে চেল্লালাম: তাহলে রিস্টার্ট বাটনটা কোথায় ভাই? আমি কি একটু সেভ দ্য গেম করতে পারি?
শাসক হাসলেন। তার হাসি থেকে ছোট ছোট ড্রোন বেরিয়ে এল, যারা আকাশে ফার্সি হরফে লিখতে শুরু করল— গেম ওভার নয়, গেম নেভার এন্ডিং।
আমার পাঞ্জাবির পকেট থেকে সেই মিসাইলের টুকরোটা বেরিয়ে এল। ওটা এখন কথা বলছে। মিসাইলটা বলছে: পারভিজ, আমি আসলে কোনো অস্ত্র নই। আমি হলাম একটা মেমোরি ড্রাইভ। আমার ভেতর রেকর্ড করা আছে সেই সব মুহূর্ত, যখন তুমি বিপ্লবের বদলে বিরিয়ানিকে বেশি ভালোবেসেছিলে।
এখন আমি আর বাঙ্কারে নেই। আমি এখন একটা ডিজিটাল সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিকে শুধু জিরো আর ওয়ান ভাসছে।
মাসালাপুর,ভল্লুকের আস্তানা,নীল চোখের সওদাগর—সবাই এখন একেকটা আইকন। আমি ক্লিক করলাম মাসালাপুরের ওপর। দেখলাম তারা এখনো চেষ্টা করছে একটা ব্যালেন্স শিট মেলাতে, যেখানে যুদ্ধের লাভ আর মানুষের লাশের ওজন সমান সমান হয়।
আমি বুঝলাম, এই পৃথিবীটা আসলে একটা গ্লিচ।
এখানে যুদ্ধ হয় কারণ শান্তি খুব বোরিং। এখানে মানুষ মরে কারণ লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম বাকি পড়ে গেছে।
আমার ফোনটা আবার বেজে উঠল। একটা নোটিফিকেশন।
একটা পত্রিকা থেকে মেসেজ এসেছে—পারভিজ, আপনার গল্পটার শেষটা একটু বেশি পরাবাস্তব হয়ে গেছে না? পাঠকরা বুঝবে তো?
আমি লিখলাম—পাঠক তখনই বোঝে,যখন সে নিজেই একটা গল্পের চরিত্র হয়ে যায়। আপনারা সবাই এখন আমার গল্পের ভেতরে। লেখাটা বন্ধ করছি, কিন্তু যুদ্ধটা চলবে। কারণ যতক্ষণ বিরিয়ানির প্যাকেটে শেষ চালটা বাকি আছে, ততক্ষণ ইনকলাব বেঁচে থাকবে।
আকাশটা আবার এক্স-রে প্লেট থেকে সাধারণ একটা কালো ক্যানভাস হয়ে গেল। কিন্তু আমি জানি, কাল সকালে যখন সূর্য উঠবে, সেটা আসলে সূর্য হবে না—ওটা হবে নীল চোখের সওদাগরদের পাঠানো একটা বিশাল গোল লাইট বাল্ব, যার বিল আমার মত অভাগা আরও হাজার হাজার পারভিজদেরকেই দিতে হবে।
