'তোমার সঙ্গে দেখা হলে' কবিতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শুরু করেছেন এভাবে -
"তোমার সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতাম
তুমি মানুষকে ভালোবাসো না,
অথচ দেশকে ভালোবাসো কেন?"
এই প্রশ্নটা একেবারে বুকের মধ্যিখানে গিয়ে লাগে না? লাগার তো কথা। যারা যুদ্ধ চায়, তারা হয়তো এই অনুভুতির ঊর্দ্ধে। কারণ, তাদের কাছে ছড়িটাই আসল। ছড়ি ঘোরানোর স্বাদ যে পেয়েছে, তার কাছে স্নেহ, মায়া, মমতার কোনও মূল্য না থাকাই স্বাভাবিক। তারা ধরেই নেয়, বন্দুক শুধু তাদের হাতেই মানায়। যে সবল, জয় তার অনিবার্য। কিন্তু ক্ষয়-ক্ষতি সবারই হয়। বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ চলে যায় বিনা দোষে। সৈনিকদের দায়ী করা যায় না। তাঁরা হুকুমের দাস। আপনজনদের সঙ্গে আর দেখা হবে না, ধরে নিয়েই তাঁরা বাড়ি ছাড়েন। অতন্দ্র প্রহরীর মতো সীমান্তে দিবারাত্র দাঁড়িয়ে থাকেন। যখন সময় আসে নিজের জীবনের বিনিময়ে দেশকে বাঁচানোর মরণপণ লড়াই করেন।
সুনীল উপরিউক্ত কবিতার শেষ অংশে বলেছেন,
"তোমার সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতাম
তুমি কী করে জানলে, আমি তোমার শত্রু?
কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই তুমি আমার দিকে
রাইফেল তুলবে?
এমন ভালোবাসাহীন দেশপ্রেমিক হয়!"
প্রশ্নটি কার উদ্দ্যেশে? রাইফেলধারী? নাকি, যে কাঁধে রাইফেল তুলে দিয়েছে? এর অন্তর্নিহিত অর্থ অবশ্য আরও গভীর।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এক অতিমারীর সম্মুখীন হয়েছিলাম। তখন যুদ্ধ করেছি একটা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে, আমরা মানুষরা। কারণ, ভাইরাস পশু-পাখিদের আক্রমণ করেনি, করেছিল মানুষকে। ভাইরাস তো আর রাজনীতি বোঝে না! সে রাজা-উজির দেখেনি, অর্থ দেখেনি, অস্ত্র দেখেনি। সে যুদ্ধে আমরা অসংখ্য মানুষকে হারিয়েছি, যার সঠিক হিসাব আমরা আজও জানি না।
অতিমারী থেমে যাবার পর ভেঙে গেল মানব বন্ধন, শুরু হল দেশে দেশে লড়াই। আমরা ভুলে গেলাম গত কয়েক বছরে আমরা কী দিন পার করেছি! যুদ্ধের উদ্দেশ্য সব সময় একই থাকে, পরিণতিও। তুলনামূলক শক্তিশালির হাতেই থাকে বিজয়-পতাকা। খবরের কাগজে, টিভিতে, অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে আমরা কিছু কিছু ছবি দেখে শিউরে উঠেছি। সাদা কাপড়ে মোড়ানো সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে মা। কী ভয়ানক সে দৃশ্য!
মৃত ছোট বোনের রক্তাক্ত মুখ দেখে একটি ছয় সাত বছরের ছেলের কান্নায় ভেঙে পড়ার ভিডিও দেখে ক'জন মানুষ চোখের জল ধরে রাখতে পেরেছে?
তবু, যুদ্ধ থামেনি। একটা শহর ধ্বংস হয়ে যাওয়া, হাজার হাজার মানুষের বলি হওয়া প্রত্যক্ষ ক্ষতি এবং তা অপূরণীয়। এর সঙ্গে রয়েছে পরোক্ষ ক্ষতিও, যার প্রভাব অন্যান্য দেশেও পড়ে। নিত্য ব্যবহার্য বেশ কিছু জিনিস মানুষের আওতার বাইরে চলে যায়। অর্থ দিয়েও নাগাল পাওয়া যা দুষ্কর। আর যারা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারে না, তারা বিকল্প রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করে জীবন ধারণের জন্য। মানুষ মেনে নিতে নিতেই বড়ো হয়, জীবন কাটায়। প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের নাগালে থাকলে সে রাজা, না থাকলে ফকির হতেও আপত্তি নেই। এই সর্বংসহা মানসিকতা থেকেই সে অন্যায়ের বিরোধিতা করতে ভুলে যায়।
সব যুদ্ধেরই একটা কৌশল থাকে, যাকে মানসিক অত্যাচার বলা যেতে পারে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের ওপর এর প্রভাব পড়ে সবথেকে বেশি। যৌণ নির্যাতন, অপহরণের মতো কাজগুলো মনোবল নষ্ট করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। এগুলি হিংস্রতার নামান্তর। এ ছাড়াও থাকে প্রতি মুহূর্তে আতঙ্ক। যুদ্ধ থেমে যাবার পরেও এই ট্রমা থেকে তারা বেরোতে পারে না।
কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধের ইতিবাচক দিক থাকে। পরাধীনতা থেকে মুক্তি, শিক্ষার প্রসার, মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যার সমাধান ইত্যাদি বিষয় ইতিবাচক যুদ্ধের অন্তর্গত হলেও বেশিরভাগ সময় আগ্রাসী মনোভাব, হিংস্রতা ও প্রতিপত্তি বা দখলদারি মানসিকতা যুদ্ধের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অগণিত মানুষের মৃত্যু, রক্তপাত, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া বাড়িঘর, তিলে তিলে গড়ে তোলা সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ যাদের মনে এতটুকু রেখাপাত করে না, যুদ্ধ তাদের নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে। সবাই তো আর সম্রাট অশোক নন!
নিহত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে থাকা মা, বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে দাদার হাহাকার, চারিদিকে শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসহায় দৃষ্টি, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন যুদ্ধের চরম নেতিবাচক দিক, যার সবটাই মনুষ্য-জীবনের পরিপন্থী। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে ছেড়া জামা গায় বাটি হাতে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো বাচ্চাদের জীবনযাত্রা লহমায় বদলে যায়। হয়তো পরিবারের সবার সঙ্গে টেবিলে বসে পছন্দের খাবার খেয়েছে এতদিন তারা। যুদ্ধ থেমে গেলেও এই মানসিক চাপ থেকে শিশু কিশোররা কি মুক্তি পাবে?
সংখ্যার বিচারে বেশিরভাগ মানুষ শান্তিকামী। কিন্তু তারা নীরব দর্শক। যুদ্ধের বাতাবরণ সৃষ্টি করতে যে আগ্রাসন দেখা যায়, যুদ্ধ বিরোধী প্রচারের জন্য সেই আগ্রাসন কোথায়? অথচ এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
কবি শঙ্খ ঘোষের 'আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি' কবিতাটিকে এই পরিস্থিতিতে খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হল। অস্তিত্বের সংকটে দিশেহারা মানুষের মানসিক অবস্থার কথা ভেবেই হয়তো কবি এই কবিতাটি লিখেছেন। শারীরিক দিক থেকে পাশাপাশি থাকা অবশ্যই জরুরি। তবে, মানসিক বন্ধনের ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন। কবিতাটির প্রথম অংশটি উল্লেখ করা হল।
"আমাদের ডান পাশে ধ্বস
আমাদের বাঁয়ে গিরিখাদ
আমাদের মাথায় বোমারু
পায় পায় হিমানীর বাঁধ।
আমাদের পথ নেই কোনো
আমাদের ঘর গেছে উড়ে
আমাদের শিশুদের শব
ছড়ানো রয়েছে কাছে দূরে!
আমরাও তবে এইভাবে
এ-মুহূর্তে মরে যাব না কি?
আমাদের পথ নেই আর
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি!"
