মাইগ্রেট

লিখেছেন:বিতান চক্রবর্তী

আলমারিটা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছে কর্ণেশ। এটা তাদের বিয়ের আলমারি। বাকি আর কিছুই সে রাখেনি। তবে অত্রির বিয়ের আলমারিটা সে রাখতে চেয়েছে। এটা অত্রির প্রিয় আলমারি ছিলো। যদিও বিয়ের পয়ত্রিশ বছরে আরও তিনটে স্টিলের আলমারি সে কিনেছে, তবু তার বাবার দেওয়া এই শিশু কাঠের আলমারিটা স্পেশাল। কর্ণেশও কোনদিন এটা বেঁচতে চায় নি। যখন যা সমস্যা হয়েছে আলমারিতে, সারিয়ে নিয়েছে। এই আলমারির বাঁ দিকের পাল্লায় আছে একটা আয়না। অত্রি চিরকাল সেই আয়নাতেই সকাল সন্ধ্যে চুল বেঁধেছে। সিঁদুর পরেছে। যে সামান্যটুকু সাজতো, তাও এর সামনেই। সকালে স্নানের পর ভেজা সোয়েটের টিপটাও এখানেই লাগিয়ে রাখত। এখনও সেই টিপের গোটা তিনেক লেগে আছে আয়নার গায়ে। এই টিপগুলোই কর্ণেশের কাছে এখন অত্রি। অত্রি নেই প্রায় দেড় বছর হল। তবু কর্ণেশ আজও এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই তার সাদা চুলে চিড়ুনি চালায়। পাপাই বলে ছিলো বটে, 'সবই যখন বেঁচে দিচ্ছো তখন আর আলমারিটাকে আগলে এতদূর নিয়ে আসবে কেন?' কথাটা যুক্তিতে ভুল নয়, তবু মন মানেনি। ছেলেকে বলেছিলো, 'সবটা দিয়ে দিয়েছি শুধু এটা রাখবো বলেই।' পাপাই আর কিছু বলেনি। তার নিজের প্রথম মুখ দেখাটাও যে এই আয়নাতেই। একতলা বাড়ি হলেও পাপাই কোনোদিনই বাবা-মায়ের সঙ্গে শোয়নি। তার নিজেস্ব ঘর ছিলো। তবে চুল আঁচড়াতে আসতো এই ঘরেই। নিজের ঘরে আয়না ছিলো না তার। মা বলতো, 'ছেলেমানুষের আবার আয়না লাগে নাকি!'। আলমারিটা এলে তার পুরোনো অভ্যাসে আবার ফেরা যাবে। এখন বাথরুমের লং মিররেই কাজ সারে সে।

আড়াই কাঠার ওপর বাড়ি বিক্রি করে যা পেয়েছে কর্ণেশ তা দিয়ে পাপাইয়ের পাশের ফ্ল্যাটটা কিনে নিয়েছে। ফ্ল্যাটটা একজন রাজস্থানির ছিলো। পাপাই আর ওই পাশের ফ্ল্যাটের মাঝখানের পার্টিসন ওয়াল ভেঙে এখন একটাই ফ্ল্যাট। এছাড়াও পুরো ফ্ল্যাটটা রেনভেট করিয়েছে পাপাই। সে কারণেই বিক্রির পরও একমাস কলকাতার বাড়িতেই থেকে গিয়েছে কর্ণেশ। অমলেশ, যে বিক্রি করিয়ে দিয়েছে বাড়িটা, পাড়ার লোক হওয়ায়, সে নিজেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে। ওদিকের কাজ শেষ। এবার পাকাপাকিভাবে কলকাতা ছাড়বার পালা কর্ণেশের। নিয়ে যাওয়ার মধ্যে নিজের জামাকাপড়, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস সবই এসে গেছে দুটো সুটকেসে। বাকি শুধু আলমারি। ট্রান্সপোর্টারের সঙ্গে কথা হয়েছে, কিন্তু শুধু একটা আইটেম নিয়ে যেতে তারাও কিন্তু কিন্তু করছে। অমলেশকে বলেছে। সে বলেছে তার চেনাজানা একটা কোম্পানি আছে। তারা পাঠিয়ে দেবে। একটু বেশিই খরচ হচ্ছে এতে, কিন্তু অত্রির শেষ স্মৃতির জন্য এটুকু...

কর্ণেশ জীবনে কোনকিছু নিয়েই কোনকালে স্মৃতিমেদুরতায় ভোগেনি। সে এই কলকাতা শহরে বেঁচে আছে বসত ঘরের পোকামাকড়ের মতন। সে আছে, কিন্তু তার অস্তিত্ব কেউ যেন টেরই পায় না। সেদিন যখন পেপারের মাসের টাকা মিটিয়ে বললো, 'আর পেপার দিও না।' ছেলেটা ঘুরিয়ে জানতেও চাইলো না, 'কেন জ্যেঠু?' শুধু, 'আচ্ছা', বলে সাইকেল চালিয়ে দিলো। তাই আর কাউকেই কিছু বলেনি। মুদি দোকান, বাজার, মাছের দোকান সকলই তাদের জীবন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত ছন্দে, কোন এক খোদ্দের কাল থেকে আর কোনদিনই আসবে না দোকানে, তাতে তাদের ভ্রুক্ষেপও নেই। এতে কর্ণেশের কোনো আক্ষেপও নেই। সেও কখনও চায়নি তাকে কেউ দেখুক, মনে রাখুক। সরকারি চাকরিও করেছে ঠিক এমনই ভাবে। মুখ লুকিয়ে দশটা-পাঁচটার ডিউটি। বছরে দুবার পুরী কিম্বা দার্জিলিং পরিবারের সঙ্গে। অফিস থেকে ফিরে অত্রির সঙ্গে দুডণ্ড গপ্পো, ছেলের পড়াশুনার খবর, রাতে হালকা খাওয়া, ঘন্টা সাতেকের ঘুম, ব্যাস তার জীবন পরিপূর্ণ। আজীবন অত্রিও অভিযোগ করে এসেছে, 'তুমি এমন পাথরের মতন ঠান্ডা কেমন করে থাকো বলো তো?' ঝঞ্ঝাট সে এড়িয়ে চলে সেই ছেলেবেলা থেকেই। নিজের বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে তোলপাড় করবার লোকও সে নয়। সারাজীবন কর্ণেশ বিশ্বাস করে এসেছে কথায় কথা বাড়ে। ফলে আড্ডা জমানোর মতন কোনো আড্ডাখানাও নেই তার। অফিসের দু-তিনজন পরিচিত আছেন যারা অত্রি চলে যাওয়ার সময় এসেছিলেন, তাদেরকেই মাঝেমাঝে কৃতজ্ঞতাবশত ফোন করত সে। তারা তাদের বাড়িতে আসবার আমন্ত্রণ জানালেও কর্ণেশ এড়িয়ে গেছে অছিলায়। যে সারাজীবনই কারোর সঙ্গে জড়ায়নি, সে নতুন করে এই বুড়ো বয়সে এসে কারোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চায় না। আসলে কর্ণেশ সেই প্রজাতির মানুষ যার কাছে সমস্ত পৃথিবীটাই এক আস্ত স্বাভাবিক বস্তু।

***

একটু রাতে করেই আজ আলমারিটা নিয়ে গেল একটা ম্যাটাডোর। পাপাই ফোন করেছিলো।

– সব গোছানো আছে তো বাবা?

– হ্যাঁরে।

– গাড়ি বলে দিয়েছো তো?

পাড়ায় তার একটি গাড়ির মালিকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, অত্রিকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া-আসার সময়। সেই দেবুকেই বলে দিয়েছে কাল সকালে আসবার জন্য।

– বলে দিয়েছি। নটা নাগাদ আসবে দেবু। তুই কি থাকবি এয়ারপোর্টে?

যদিও কর্ণেশ পাপাইয়ের গুরগাও-এর ফ্ল্যাট চেনে, তবু প্রতিবারই পাপাই আসে এয়ারপোর্টে। নতুন ফ্ল্যাটটা কেনার পর থেকে কর্ণেশ বার দশেক গিয়েছে গুরগাওতে। চিনে নিয়েছে আশপাশটা। ওদের সোসাইটির মধ্যেই একটা পার্ক আছে। বিকেলে প্রতিদিনই কর্ণেশ তার নাতিকে নিয়ে গিয়েছে সেখানে। আশেপাশের কয়েকটি ফ্ল্যাটের বয়স্কদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। আসলে সে আলাপ করতে চায়নি, ওরাই গায়ে পরে আলাপ জমিয়েছে। নতুন জায়গা বলে খুব বেশি ইগনোরও করতে পারেনি কর্ণেশ। মোদ্দাকথা হল, গুরগাও এখন তার কাছে কলকাতারই মতন পরিচিত। তবু পাপাই এলে সুটকেসগুলো নিতে সুবিধে হবে।

         – হ্যাঁ, বাবা আমি থাকবো। মধু আসতে পারবে না। বাবুকে সে সময় অ্যাবাকাস ক্লাস থেকে আনতে যেতে হয়।

         – আরে মধুকে আসতে হবে কেন? তুইও অফিস কামাই করিস না।

         – বাবা কাল শনিবার। আমার উইক এন্ড।

আজকাল আর দিন, বার মনে থাকে না কর্ণেশের। রিটার্মেন্টের পর থেকে এইসব বার ইত্যাদিও নিরর্থক হয়ে গেছে তার জীবনে। পেনশন এলে এসএমএস—ই মনে করিয়ে দেয়। প্রয়োজন মতন টাকাও তুলে আনে। ফলে তারিখ, বার তার কাছে বাহুল্যমাত্র। প্রায় বারো বছর হয়ে গেল প্রতিদিনের ব্যালকনিতে এসে পড়া পেপারটাও সে পড়েনি। অত্রি পড়তো বলে পেপার আসত। ও চলে যাওয়ার পরও সেই অভ্যাসেই এই দেড় বছর এসেছে পেপারটা। বেশিরভাগ দিন ব্যালকনিতেই পড়ে থাকতো। পরেরদিন সকালে কাজের মেয়েটি ঝাড় দেওয়ার সময় তুলে রেখে দিত পাশের টেবিলে।

         – হুম, বাবু ঘুমিয়ে পড়েছে?

         – না, না। সে এখন গেম নিয়ে বসেছে।

         – আচ্ছা। তুই শুয়ে পড়। কাল দেখা হচ্ছে।

ফোন কেটে দিয়ে শুতে যায় কর্ণেশ। আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পায়ের দিকে তাকাতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। অত্রির বিয়ের আলমারির জায়গাটা ফাঁকা।

 

***

 

মাত্র চারদিনেই কর্ণেশ সেটেল করে গেছে। কোন কালেই তাকে কোনো নতুন অভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ পেতে তপস্যা করতে হয়নি। অত্রির চলে যাওয়ার পর নিজের একাকিত্বেও সে গুছিয়ে নিয়েছে দু-একদিনেই। দিনের অভ্যাসবসত কোনো কোনো সময় অত্রিকে মনে পড়া ছাড়া আর কোনো সময়েই অত্রি নেই বলে তার জীবন থেমে গিয়েছে বলে বিশ্বাস হয়নি। এমন কী অত্রির দৈনন্দিন অভ্যাসকে কর্ণেশ বয়ে নিয়ে যায়নি একদিনও। অত্রির ঠাকুরঘরের জিনিষপত্র একে-ওকে দিয়ে দিয়েছে শ্রাদ্ধশান্তির কাজ মিটতেই। এক সময় ঠাকুরঘরটিই কর্ণেশের বাতিল আসবাবপত্র রাখবার ঘর হয়ে ওঠে। অনেকদিন পর পাপাই এসে এসব দেখে বেশ চমকে উঠেছিলো। “তুমি মায়ের ঠাকুরঘরকে ভাড়ার ঘর বানিয়েছো?” কর্ণেশ মুচকি হাসে। “আরে মা যে বলতো, এতে সংসারের অকল্যাণ হয়!”

—পাপাই, যে সংসার তিন মাস পর অন্য কারোর হবে, তার কল্যাণ অকল্যাণ নিয়ে ভাবনাটা একটু বেশি গায়ে পড়া মনে হয় না তোর?

ফ্ল্যাটের এই নতুন অংশেও কোনো ঠাকুরঘর রাখেনি কর্ণেশ। মধু একটু অবাকই হয়েছিলো। একদিন ডিনার টেবিলে হালকা করে তুলেছিলো প্রসঙ্গটা, “বাবা তোমার ঘরের কোথাও অন্তত একটা ঠাকুরের ছবি রাখো। এখানে নাস্তিকদেরও মুসলমান হিসেবে ধরা হয় কিন্তু!” এ আঁচ যে কর্ণেশ পায়নি তা নয়। তার দিকের ব্যালকনিটা খুললেই পাশের ফ্ল্যাটের ঝুলন্ত ব্যালকনিটা দেখা যায়। নতুন পড়শি দেখে পাশের ফ্ল্যাটের এক গাট্টাগোট্টা বয়স্ক লোক কর্ণেশকে ‘নমস্তে’ বলে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় কর্ণেশও নমস্কার জানিয়ে ভেজা গামছা না মেলেই ফিরে আসছিলো উলটো দিকের মানুষটি নিজেই কথা শুরু করে দিলো। “নয়ে আয়ে হে?”

— জি।

— কাহাসে হো জি আপ?

— কলকাতা।

— আপকা নাম?

— কর্ণেশ অধিকারি।

— কর্নেল?

— না, না। কর্ণেশ। ‘শ’ লাস্ট ম্যায়।

— আচ্ছা, আচ্ছা। তো আধিকারি কনসা গোত্র হতে হ্যায়?

এতো মহামুশকিল। যে জন্মে তার জম্মছকই বানায়নি, মন্দিরে গেলে পুজো দিতো অত্রি আর কর্ণেশ তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতো তাকে জিজ্ঞেস করেছে গোত্র! বেশ কয়েক মিনিট ভাবনার পর প্রায় আন্দাজেই বলে দিয়েছিলো শাণ্ডিল্য। আর ঠিক তার পরের প্রশ্নই ছিলো, “শাণ্ডিল্য মতলব? ইয়ে কোনসা জাত হুয়ে?” এতো আরেক কেলেঙ্কারি! জাত তো হিন্দু। কিন্তু সে মাতম্বর মানবে না। “নেহি ও ওয়ালা জাত নেহি। ব্রাহ্মণ ইয়া অউর কই জাত?” মধু ঠিক সেই সময়েই ব্যালকনিতে বসানো টবে জল দিতে এসেছিলো। সে সামাল দিলো ব্যপারটা। “আঙ্কেলজি, হাম লোগ ব্রাহ্মিন হ্যায়।“ এতক্ষণে যেন লোকটার ধড়ে প্রাণ এলো। “বহুত বড়িয়া বেটিয়া। হাম লোগ ভি ব্রাহ্মিণ হ্যায়। পরন্তু আপ লোগ মছলি খাতে হ্যায় ক্যায়সে?” আরে, দাঁত দিয়ে খাই! এ আবার জিজ্ঞেস করবার কী আছে? মধু এর কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল একটু হেসে মগটা নিয়ে চলে আসে ভেতরে। কর্ণেশও রেলিং-এ গামছা মেলে যেতে উদ্যত হতেই লোকটি বললো, “মেরা নাম জীতেন্দর শর্মা হ্যায়। কভি আইয়ে নীচে পারাক ম্যায়ে? ব্যায়ঠকে গপ্পে মারেঙ্গে।“ কর্ণেশ লোকটির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ায় জন্য, “জরুর, জরুর” বলতে বলতে ঘরে ঢুকে ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে। তবু তার ইচ্ছে হয়নি ঘরে কোনো ঠাকুর দেবতার ছবি টাঙাতে। চেনা বামুনের কী আর পৈতে লাগে?

এখানে সকালে বাজার বসে না। সকালে বাজার বলতে, দুধ, পাউরুটি, ডিম ইত্যাদি। যা কিছু ফ্রেস সবজি বাজার তা সন্ধের জন্য রাখা থাকে। এসব অভ্যাস করতেও বেশি সময় লাগেনি কর্ণেশের। বাচ্চাটাকে পার্কে ঘুরিয়ে উপরে রেখে এসে সে বেড়োয় বাজার করতে। মধুর থেকে জেনে নেয় কী কী লাগবে। এখানে চিকেন, মাছ পাওয়া যায় না মার্কেটে। সেসব অ্যাপ-এ আসে। কর্ণেশ এখনো এই অ্যাপের ব্যবহারটা শিখে নেয়নি। মধুই দিয়ে দেয়। ডিম কেনে কর্ণেশ। এখানে ফুলকপি, বাধাকপি, গাজর সারা বছরই পাওয়া যায়। গাজর, লম্বা লাউ, ফ্রোজেন মটর দিয়ে ডালই প্রায় প্রতিদিন হয়। রুকসানা সকালে এই ডাল, ডিম বা মাছ ভাজা আর ভাত করে দেয় পাপাইকে। বাবু ব্রেড, ওমলেট আর জুস খেয়ে স্কুলের বাস ধরে। টিফিন হয় স্কুলের ডায়েট চার্ট দেখে। বাবুর খাওয়ার মধুই করে দেয়। কর্ণেশ সকালে দুটো পাউরুটি টোস্ট করে নেয় টোস্টারে। তাতেই তার ব্রেকফাস্ট হয়ে যায়। লাঞ্চ করে তাড়াতাড়ি। বাবু ফেরার আগে। বাবু স্কুল থেকে ফিরলে বাড়ি জুড়ে এক দক্ষযজ্ঞ চলে। এ ঘর থেকে ও ঘর সে দৌঁড়ে বেড়ায়। স্কুলের অসম্পূর্ণ 'সরাসত' সেরে নেয় বাড়িতে। তারপর স্নান সেরে খেতে বসলে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। মধুর গলা বারোতলা থেকে চোদ্দতলাতে ওঠে। তবু প্রায় দিনই খাওয়া শেষ না করে উঠে যায় বাবু। কর্ণেশ এটা এনজয় করে। এই সময়টা কেটে যায় হুস করে। ঝুপ করে নৈশব্দ নামে ফ্ল্যাটে বাবু ঘুমিয়ে পড়লে। কর্ণেশ আজকাল মোবাইলেই সিরিয়াল দেখা শুরু করেছে। দুপুরে ঘুমালে রাতে ঘুম আসতে চায় না। সাড়ে পাঁচটা বাজলে নীচে নামে বাবুকে নিয়ে। সে তার সোসাইটির বন্ধুদের সঙ্গে মেতে ওঠে খেলায়। কর্ণেশ অনিচ্ছা স্বত্তেও গিয়ে বসে পাশের ফ্ল্যাটের বুড়োদের বেঞ্চে। এ এক আজব বেঞ্চ। এমন আলোচনা কর্ণেশ বাপের জন্মেও শোনেনি। কার বউমা কোন ব্রত করে না। হিন্দু সোসাইটিতে কেন মুসলমান কাজের লোক থাকবে। কার পেটের ব্যথা গ্রামের গুরুজি পেশি টেনে ঠিক করে দিয়েছে। কার গ্রহের দোষ কেটে গেছে কোন মন্দিরে পুজো দিয়ে। কর্ণেশকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে দেয়, বাঙালি কালাজাদু নিয়ে। প্রথমে সে এসব এড়িয়ে গেলেও আজকাল তার পড়া তন্ত্রের উপন্যাস থেকে তাড়িয়ে শোনায় নানান গপ্পো। সে মজা পায় এই সব গালগল্প গোগ্রাসে গেলে এই হাইরাইজের বাসিন্দারা। অল্প কিছুদিনেই অলৌকিক গল্প বলিয়ে হিসেবে বেশ নাম হয়েছে কর্ণেশের। সে কোনো একদিন আড্ডায় না গেলেই পরের দিন একস্ট্রা গল্প শোনাতে হয়। এতকাল ধরে পড়ে আসা গল্প-উপন্যাসগুলোর এই যেন সঠিক ব্যবহার হচ্ছে। এই হয়ত আড্ডার মজা। আজকাল মাঝে মাঝে ভাবে কর্ণেশ, এমন আড্ডার মজা সে এতকাল এড়িয়ে এসেছে!

***

 দুদিন হয়ে গেল রুকসানা আসছে না কাজে। ফোনটাও বন্ধ। সকাল থেকে সব কিছু মধুকেই সামলাতে হচ্ছে। হরিয়ানার কোন এক শহরে দাঙ্গা হয়েছে। তাই সমস্ত গুরুগ্রাম জুড়ে বন্ধ মাছ-মাংসের দোকান। পাপাই খবর নিয়ে এসেছে বেশিরভাগ দোকানই ভেঙে দিয়েছে হিন্দুপন্থী সংগঠন। মধু বললো, সম্ভবত রুকসানাদেরও এই কারণে তাড়িয়ে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। বিকেলে সে খবর পাক্কা হল। আজকের পার্কের আড্ডার প্রধান বিষয়ই ছিলো এই দাঙ্গা এবং সোসাইটিতে আর কখনও যেন কেউ মুসলমান কাজের লোক না রাখে সে নিয়ে কড়া নির্দেশ জারি করবার দাবি। কর্ণেশ বললো, 'বাট যো লোক ইহাপে কাম করনে কে লিয়ে আতে হ্যায় ও তো দাঙ্গা নেই করতে। ও লোক তো বহুত শান্ত হ্যায়।' বাকিরা রে রে করে উঠলো। প্রত্যেকে অন্তত শ-খানেক এন্টিমুসলমান গল্পো শুনিয়ে দিলো। কর্ণেশ বুঝলো এ নিয়ে তর্কে না যাওয়াই ভালো। সে চুপ করে কেবল মাথা নাড়িয়ে গেল। রাতে রুকসানা ফোন করলো মধুকে। সে হরিয়ানা ছেড়ে দেশে যেতে চায়, কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় পাহাড়া দিচ্ছে দাঙ্গাবাজেরা। যদি পাপাই কোনো গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয় তাদের জন্য! মধু ব্যপারটা নিজের মতন করে সামলে নিলো। বলে দিলো, 'আরে তোমার দাদাতো শহরে নেই। অফিস ট্যুরে মুম্বাই গেছে। থাকলে ও নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করে দিত।' রুকসানা আশাহত হয়ে ফোনটা ছেড়ে দিলো। কর্ণেশ বেশ নিশ্চিন্ত হল। এইসব ঝামেলায় না পড়াই ভালো। ওদিকে সোসাইটি গ্রুপেও আলোচনা চলছে কারোর বাড়িতে যেন মুসলমাস কাজের লোক না রাখা হয়। কেউ কেউ বলেছে এখানে লোকাল কাজের লোক তো পাওয়াই যায় না। তাদের বেশ করে অনলাইন লিঞ্চিং করা হয়েছে। রুকসানারা আসে উত্তরবঙ্গের নানান গ্রাম থেকে। বেশ সস্তায় কাজ করে ওরা। লোকাল কাজের লোকেরা তাই এই বাঙালি কাজের লোকগুলোর ওপর চটে থাকে সারা বছরই। দুদিন পরেই কোনো এক ফ্ল্যাটের রেফারেন্সে নতুন কাজের লোক এসেছে ঘরে। মাইনে চেয়েছে রুকসানার ডবল। অন্যদিকে সে আবার রুটি-ডাল ছাড়া আর কিছুই বানাতে জানে না। আমিষ সে বানাবে না। সবেতেই রসুন দেয় সে। প্রায় দিনই খাবার ফেলতে হচ্ছে। সপ্তাহখানেক এসব চলার পর মধু মেয়েটিকে রান্নার কাজ থেকে অব্যহুতি দিয়ে কেবল ঘর পরিস্কারের জন্য রেখেছে। কিন্তু তাতেও সে মাইনে কমাবে না। অগত্যা গিলতে হয়েছে সেই আবদারও। 

এসব শান্ত হতে সময় নিলো দুমাস। পাপাই মাসে দু-তিন বার প্রায় সাতাশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে দিল্লি থেকে মাছ-মাংস কিনে এসেছে। এই কয়েক মাসে কর্ণেশ কিছু কিছু রান্না শিখে নিয়েছে। আলুর তরকারি, ডাল। মধুর খানিক সুবিধে হয়। মেয়েটা এই দুরন্ত ছেলেকে নিয়ে সবটা সামলাতে পারে না। চায়ের জন্য কর্ণেশই অনলাইনে কিনেছে ইলেকট্রিক কেটেল, টি পট। মধুও আজকাল গ্রিন টি ব্যাগে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। পরিস্থিতিই মানুষের কমফোর্ট জোন ভাঙে। না হলে দিনে দুবার রুকসানার বানিয়ে দেওয়া আদা দিয়ে দুধ চা ছাড়া মধুর মনই ভরতো না। তিনমাস পর রুকসানা ফিরে এলো কাজে। তাকে পুনবহাল করতে অপেক্ষা করতে হল আরও কয়েক সপ্তাহ। মাস শেষ না হওয়া অবধি পুরোনো মেয়েটিকে ছাড়াতে পারছিলো না।

খাওয়ার টেবিলে সেদিন এসবই আলোচনা হচ্ছিলো। পাপাই বললো, সুযোগ পেলেই ব্যাঙ্গালোর পালাবো বাবা। এসব ঝামেলা নেয়া যাচ্ছে না। মধুর ইচ্ছে মুম্বাই। দুটো শহরই বেশ দামি। কর্ণেশের কোনও শহরই অপছন্দের নয়। তবে আজকাল ভাবে অন্য শহরে তার এই গাল-গল্প শোনবার লোক কী পাওয়া যাবে? মধু সোসাইটি গ্রুপ থেকে পড়ে শোনায়, কেউ একজন নতুন টেনেন্ট বিজ্ঞাপন দিয়েছে তার বাড়িতে কাজের জন্য হিন্দু কাজের লোক চায়। কিছু মানুষ তাতে আপত্তি জানানোয়, অন্য লোকেরা এসে সেই সব অসাম্প্রদায়িক লোকদের আচ্ছা করে হিন্দুত্বের পাঠ পড়িয়ে গেছে। ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে তুলতে কর্ণেশই বলে, যাই বল, কলকাতা এসব থেকে বেঁচে আছে এখনো। পাপাই মধু দুজনই এগ্রি করে। ভাতের প্লেট শেষ করতে করতে পাপাই বলে, “যাইহোক বাবা, রুকসানা এসে গেছে এবার খানিকটা নিশ্চিন্ত।“ যদিও মধুরা মনে করিয়ে দেয়, “আমি কিন্তু বলেছিলাম, ওই সময় তুমি বাইরে ছিলে!'

এবারের পুজোটা বেশ ভালই কাটলো কর্ণেশের। সোসাইটিতেই বাঙালিরা মিলে একটা আধা বাঙালি আধা নর্থ ইন্ডিয়ান দুর্গা পুজো করে। সকালে পুজো, অঞ্জলি, ভোগের পর রাতে ডিজে বাজিয়ে ডান্ডিয়া। এক অন্য উন্মাদনা। তবে ভোগে মাছ দেওয়া নিয়ে এক তুমুল বিতণ্ডা হয়েছে। নবরাত্রিতে মাছ দেওয়া যাবে না, উত্তর ভারতীয়দের এমন দাবিকে মান্যতা দিয়েই নিরামিষ ভোগেই পুজো সম্পন্ন হয়েছে। একদিন মটন ভুনা, চিকেন বিরিয়ানি, একদিন তন্দুরি চিকেন অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপেই কিনে খেয়েছে কর্ণেশরা। তাও বেশ লুকিয়েচুরিয়ে। আশেপাশের লোক গন্ধ পেলে আবার কী সমস্যা বাঁধায়! লক্ষ্মী পুজো করে মধু। সোসাইটর দু-চারজন বাঙালিকে ডেকে ভোগও খাওয়ায়। সকলেই সেদিন কথায় কথায় এই পুরো পুজোয় মাছ না খেতে পারার ক্ষোভ উগরে দিয়ে গেল। কিন্তু সাহস করে বলতে পারলো না, কলকাতাতেই চলে যাবো!

নবরাত্রির ক্লান্তি ভুলে সমস্ত গুরুগ্রাম দিওয়ালির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কর্ণেশ পার্ক থেকে ফিরে মধুর কাছ জানতে চায়, 'বাজার থেকে কী আনতে হবে মধু?'

— বাবা আজ আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।

— ওমা কেন?

— আরে কাল করবা চৌথ না! অনেক কিছু কিনতে হবে।

— সে আবার কী?

— ও এক পুজো। স্বামীর মঙ্গল কামনায় করতে হয়, সারাদিন উপোষ করে। আরে তুমি সিনেমায় দেখোনি?

— আরে সেতো এখানকার মানুষ করে। তুমিও করো নাকি?

— না করে উপায় আছে? সারা সোসাইটি মাথা খারাপ করে দিয়ে ছিলো প্রথম বছর। তারপর থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে। ও মেহেন্দিও পড়তে হবে আবার। তুমি দাঁড়াও, আমি আসছি রেডি হয়ে। বাবু, ডোন্ট পুট অফ ইয়োর সু, আমরা বাইরে যাবো।

মার্কেট আজ ভিড়ে ভিড়াকার। মহিলারাই বেশি। নানান জায়গায় স্টুল পেতে বসে মেহেন্দি পড়ছে মেয়েরা। দোকানেও প্রবল ভিড়। মধু প্রথমেই লাইন দিয়েছে মেহেন্দির ওখানে। বেশ অনেকে আছে অপেক্ষায়, ফলে সময় লাগবে। মেহেন্দি পড়ে তারপর বাজার করবে। তাড়াহুড়োই বা কী আছে! সবে সাতটা বাজে। পাপাই আসবে সেই সাড়ে নটা। কর্ণেশ বাবুকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোসাইটির বাইরের রাস্তায় বেড় হয়। বড়, চওড়া রাস্তা। ঠিক শহুরে ব্যস্ত রাস্তা নয়। এটা আশেপাশের তিনটে সোসাইটির নিজেস্ব রাস্তা। পার্সোনাল গাড়ি, বাইক ছাড়া আর কিছুই চলাচল করে না। মেইন রাস্তা আরেকটু দূরে। সন্ধ্যেবেলাতে রাস্তা বেশ ফাঁকাই থাকে। কিছু মানুষ ঘরের পোষ্যকে নিয়ে ঘুরতে বেড় হয়। রাস্তার দুধারে গাছের সারি। মূলত চাঁপা আর বোগেনভিলিয়া। গাছের সামনেটুকু খানিক উঁচু করে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারই উপর কেউ কেউ বসে আড্ডা দেয়। এরা মূলত সোসাইটিগুলোতে কাজ করে। এটা তাদের ডিউটি ব্রেকের জায়গা। বাবুকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় মেইন রাস্তার কাছে চলে এসেছে কর্ণেশ। একটু দূরের স্ট্রিট লাইটের শেষ আলোর টুকরো ফেইড হয়ে পড়েছে রাস্তার ওপর। সেই আধাঅন্ধকারের মধ্যে থেকেই কে যেন ডাকলো কর্ণেশকে। “আঙ্কেলজি!” কর্ণেশ ঠাহর করতে পারলো না লোকটা কে? চোখ ছোট করে মানুষটার মুখ চেনার চেষ্টা করলো। “নমস্তে আঙ্কেল! আপ লোগোনে ফিরসে রুকসানা কো কামপে রাখলি?” লোকটাকে চেনে না কর্ণেশ। কিন্তু সে এই প্রশ্ন কেন করছে? কথার উত্তর না দিয়ে সোসাইটির দিকে ফেরে কর্ণেশ। লোকটিও উঠে তার পিছু নিয়েছে। ঠিক ধাওয়া না করলেও তাদের ফলো করছে। অনেককাল পর কর্ণেশ ভয় পেল। মনে মনেই বলে উঠলো, হে ঈশ্বর রক্ষা করো! বাবুর জন্য জোরে হাঁটা সম্ভব হচ্ছে না। বাবুও বুঝতে পেরেছে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে, তার নানান আপনভোলা প্রশ্ন থেমে গিয়েছে। আর পা দশেক হাঁটলেই সোসাইটি গেট। কপালে, পিঠে ঘাম জমেছে কর্ণেশের। এবার লোকটা থেমে গেল। শুধু উঁচু গলায় বললো, “ইয়ে আচ্ছে নেহি কিয়ে আপলোগোনে! নেকস্ট টাইম উন লোগোকে সাথ আপ লোগোকা ঘর ভি…” শেষ শব্দটা হাওয়াতে ভেসে গেল অন্য পথে, কর্ণেশের কানে এলো না।

কালী পুজোর সঙ্গে সঙ্গেই হাওয়াতে হালকা হিমেল ছোঁয়া এসেছে এই প্রদেশে। রাত হলে চাদর গায় দিতে হচ্ছে আজকাল। কিন্তু শ্বাস নেওয়াটা অসহ্য হয়ে উঠেছে। চারিদিকে ধূসর ধোঁয়াশার চাদর। বাবুদের স্কুলও ছুটি দিয়ে অনলাইনেই চলছে এখন। খুব প্রয়োজন না পড়লে কর্ণেশ বাইরে যাচ্ছে না। পার্কে যাওয়াও বন্ধ করেছে। পার্কের আড্ডা আজকাল বসছে কারো না কারোর ফ্ল্যাটে। কর্ণেশ বেশিরভাগ আড্ডাই এড়িয়ে চলে। যদিও মধু বারবার না করে এদের এড়িয়ে চলতে। “দেখ একই সাথে থাকি, এদের এড়িয়ে চললে এরা কিন্তু আমাদের শত্রু হয়ে উঠবে।“ পাপাইয়েরও একই মত। তাই কখনও কখনও কোনো কোনো আড্ডায় যায় কর্ণেশ। তবে আগের মতন আর খুলে মিশতে পারে না। তার ভয় হয়। চুপ করে থাকে বেশি সময়। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নানান খবরে স্বরগরম হয়ে থাকে আড্ডা। কোন দেশে মাটি খুঁড়ে হনুমানের একশো ফুটের গদা পাওয়া গেছে, কোথায় চল্লিশ ফুটের পদচিহ্ন, কোন শাস্ত্রে লেখা আছে সকালে উঠে কোন মন্ত্র পড়লে আয়ু বাড়ে ইত্যাদি। আবার কখনও হিন্দু নিধনের মিথ্যে খবরে ওদের মধ্যে জ্বলে ওঠে দ্বেষের আগুন। কর্ণেশ আরও গুটিয়ে যায়। আলোচনাটা যেন রুকসানা অবধি না যায়! সপ্তাহখানেক আগে অনলাইনে হনুমানজির মস্ত ফটোফ্রেম কিনেছে সে, শোয়ার ঘরে টাঙাবার জন্য। কারণ যে কোনোদিন তার ঘরেও আড্ডা বসতে পারে। পাপাই কিনে এনেছে নকল ফুলের মালা। ছবিতে মধু গোলা সিঁদুর ফোটা পরাতে পরাতে মনে করালো, “ছবি কিনলে, মালা কিনলে না বাবা? এতো আর শো পিস নয়! এই শোনো তুমি একটা মালা কিনে এনো তো আজ। আর একটা হনুমান চল্লিশা।“

—কিন্তু আমি তো হিন্দি পড়তে পারি না!

কর্ণেশ বেশ বিব্রত হল।

—পড়তে হবে না বাবা। ছবি আছে আর চল্লিশা নেই, এ কেমন কথা! ঝামেলায় পড়বে তো!

দাড়িটা বেশ বড় হয়েছে। অনলাইনেই নাপিত ডেকেছে আজ কর্ণেশ। বিকেলে পার্কের সকলে আড্ডায় আসবে। তাই দুপুরেই ডেকে নিয়েছে। আজকাল নিজে দাড়ি কাটতে গেলে গাল কাটে অথবা এক গোছা সাদা দাড়ি থেকে যায় চোখের ভুলে। মধু আর বাবু আজ নেই। বাবুর কোন এক বন্ধুর বার্থ ডে পার্টিতে গেছে। অ্যাপে দেখাচ্ছে ছেলেটা আসছে আর দশ মিনিটেই। নীচে সিকিউরিটিকে ফোন করে বলে দিতে হবে ছেলেটার নামধাম।

— সাহাব বলিয়ে?

— শুনো ভাই, এক লড়কা আয়ে গা বাহারসে। নাম হ্যায়, সুলতা…

নামটা উচ্চারণ করতে গিয়েই থমকে যায় কর্ণেশ। সে খেয়ালই করেনি আগে নামটা। হঠাৎ তার মাথা খালি হয়ে যায়। আগে দেখলে ক্যানসেল করে দিত স্লট। যদি আশেপাশের কেউ জেনে যায়? যদি সিকিউরিটির ছেলেটা বলে দেয় সকলকে…

— সাহাব, ক্যায়া নাম বাতায়ে? হ্যালো?

ওপাড়ে ছেলেটা চিৎকার করছে। কর্ণেশ কোনক্রমে ঢোক গিলে বলে, “সুলতান।“ এতটাই ধীরে বলে নামটা যে, সিকিউরিটি ঠিক মতন শুনতে পায় না। সে রিপিট করে, “মুলতান?” কর্ণেশ কোনক্রমে ‘হ্যাঁ’ বলে ফোনটা ছাড়ে। ড্রয়িং রুমে একটা খাওয়ার চেয়ার সরিয়ে এনে বসবার জায়গা করেছিলো সে। সেই চেয়ারেই বসে পড়ে কর্ণেশ। এই দুপুরে ফাঁকা ঘরে একজন মুসলমানকে ঢোকাবে? যদি পাশের ফ্ল্যাটের শর্মা জি জানতে পারে? মাথা ফাঁকা হয়ে আসছে। আজকাল এমনটাই হয় তার। রুকসানা যতক্ষণ কাজ করে, কর্ণেশের বুক ঢিপ ঢিপ করে। সে সময় বাইরের দরজায় বেল বাজলে কপালে ঘাম জমে। আজকাল ময়লার প্যাকেটটাও হয় সে নিজে অথবা মধু বের করে দেয়। অ্যাপে নোটিফিকেশন এলো, সুলতান লোকেশনে এসে গেছে। কর্ণেশ অনিচ্ছাস্বত্তেও উঠে পরে। ছেলেটা আসলে ওকে না করে দেবে? ঘরেও ঢুকতে দেবে না? যদি কারণ জানতে চায়? শরীর খারাপ বলে দেবে! ছেলেটা যদি জল চায়? জিতেন্দরজি সেদিন বলছিলো ওদের ঘরে অন্য জাতের লোকেদের জন্য জল খাওয়ার আলাদা গ্লাস রাখা থাকে। তাদের ঘরে তো এদের জন্য আলাদা কোনো গ্লাস বা বোতল রাখা নেই!

 

 

 

0 Comments
Leave a reply