আধুনিক সময়ে মানুষ, যারা যুদ্ধের সরাসরি মৃত্যু-যন্ত্রনা ও আর্তনাদ থেকে আপাতত বাইরে, তারা নিরাপদে ড্রয়িংরুমে বসে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে যুদ্ধকে বিনোদন হিসেবে পেয়ে যাচ্ছেন। আকাশ ফালা ফালা করে মিসাইল বা বোমারু বিমানের যাতায়ত, চৈত্র সেলের স্টক ক্লিয়ারেন্সের মত বোমা আসহায় মানুষের উপর নিঃশেষে ক্ষেপণ, হাসপাতালে, শিশুদের স্কুলে জনপদে সর্বত্র, টেলিভিশনে এই সব দৃশ্য কফির পেয়ালা হাতে দেখতে দেশে মানুষ চলচ্চিত্র দেখার আনন্দ পাচ্ছেন। মানুষের মানুষের প্রতি সহানুভূতি ক্ষীয়মান, কেননা মানুষকে আমরা অন্য রাষ্ট্রের বা শত্রু-দেশের বাসিন্দা হিসেবে ভাবতে শিখেছি। আমারা একজন মানুষকে সম প্রজাতির একজন অথবা আত্মীয় হিসেবে ভাবতে ভুলেছি।
যে মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার মত মহৎ গুণ রয়েছে, রয়েছে সহানুভূতির মত কোমল আবেগ, তবু সে কেন বারংবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে? মানুষ শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, বিজ্ঞানে, কারিগরি দক্ষতায় যত এগিয়েছে, মারণাস্ত্র নির্মানে এবং ধ্বংসের খেলায় ততই মেতেছে। আধুনিক যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রগুলি ধংস করছে জীবন, ভেঙে ফেলছে অর্থনীতি আর আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছে আতঙ্ক আর অবিশ্বাস।
মানুষের অন্তরে অমৃত যেমন আছে, বিষও রয়েছে তেমনি। মানুষের মধ্যে যে অপ্রতিরোধ্য ‘লোভ’ তার বিকৃত বিকাশ ঘটেছে তার অর্থনৈতিক কারবারে। আধুনিক শোষকদের অর্থনীতির চালিকা শক্তি ‘ভোগ’ নামের প্রবৃত্তি, যা প্রতিনিয়ত পরাভূত করছে দয়া, সহানুভূতির মত মানবিক গুণাবলীকে। যুদ্ধের পেছনে থাকে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা। মানুষের এইসব দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বপ্রবণ নেতারা মূলত অর্থনৈতিক আধিপত্য বাড়াতে যুদ্ধ বাধায়, যুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী ও যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলে। তখন জাতির নামে, কখনো ধর্মের নামে ধ্বংসের উন্মাদনায় মেতে উঠতে তাদের বাধা থাকে না। নানা ছলে মানুষের সম্মতি আদায় করা হয় যুদ্ধের স্বপক্ষে।
দু – দুটো বিশ্বযুদ্ধের, বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি ও পরিনতি নিয়ে এখনো অনেক দেশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবু, এই তিক্ত যুদ্ধ-স্বাদ, যুদ্ধ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় নি। এরপরেও আমাদের মনে পড়বে, কোরিয়ার যুদ্ধের কথা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা, আফগানিস্তান, ইরাক যুদ্ধের বাতাবরণ। আমাদের দেশের বারংবার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া (১৯৪৭-৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১) আমরা ভুলতে পারিনি। এর আগে চীনের সঙ্গে সীমান্ত লড়াই আছে। এরপরেও কার্গিলে যুদ্ধ বেধেছে। বর্তমানে আমেরিকা ও ইরানের অদম্য যুদ্ধ স্পৃহা এবং রাশিয়া বনাম ইউক্রেনের লাগাতার যুদ্ধ আমাদের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে অনুমান করছেন।
অনেকগুলি কারণের পরিণতিতেই যুদ্ধ বাধে। সীমান্ত নিয়ে গোলোযোগ, জাতীয়তাবাদ, বর্ণ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ, মতাদর্শগত বিভেদ, মীমাংসা না হওয়া সীমান্ত সমস্যা, অতীত ইতিহাসের স্মৃতি, এগুলি তো আছেই তবে এগুলিই শেষ কথা নয়, অর্থনৈতিক আগ্রাসনের কারণে বাণিজ্যিক সুবিধাজনক অঞ্চলগুলির উপর দখল কায়েম, অন্যতম যুদ্ধের কারণ। আমেরিকা ও ইরানের যুদ্ধের পেছনে হরমুজ বন্দর একটি ‘স্ট্র্যাটিজিক জোন’ হিসেবে বড়ো ভুমিকা নিয়েছে। পৃথিবীর জ্বালানি ব্যাবসার এক বিরাট অংশ সেখানের শান্তির উপর নির্ভর করে থাকে। আমেরিকা যে অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়েছে, ইরান তাকে অর্থনৈতিক আক্রমণ হিসেবাই দেখছে। রাশিয়ার পুতিন উক্রেনের ইয়োরোপ ঘেঁষা নীতি বিশেষত NATO সদস্যভুক্তি ভালো চোখে দেখেননি। এখানে সমস্যা আঞ্চলিক আধিপত্যের।
আঁতাত, শান্তিচূক্তি এইসব যুদ্ধ-সমস্যার মীমাংসার চূড়ান্ত পথ নয়। এগুলির মাধ্যমে হয়ত সাময়িক যুদ্ধ বিরতি হতে পারে। মানুষ তার জীবন চর্যায় যতদিন পর্যন্ত না ব্যাপক পরিবর্তন আনছে, যুদ্ধ ও ধ্বংসের শেষ হওয়া সম্ভব না। যে অর্থনীতি ‘লোভ’ আর ‘মুনাফা’ নিয়ন্ত্রিত তার বিকল্প ভাববার সময় এসেছে। শিক্ষা যদি বিশ্বমানবতার জন্ম না দেয় তবে তা কি প্রকৃত শিক্ষা? একমাত্র সচেতন নাগরিক মতামত প্রবল চাপে রাখতে পারে রাষ্ট্রীয় অপকর্মগুলিকে। গণতন্ত্রের প্রসার এবং বিশ্বমানবতাবাদী শিক্ষার প্রসার আজকের দিনের পথ হওয়া উচিত।
