রূপান্তরিত যুদ্ধের তান্ডবে বিষাক্ত বাস্তুতন্ত্রঃ বিলুপ্ত ও বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

লিখেছেন:জয়ন্ত কুমার মল্লিক

মুখবন্ধ 

The environment is the silent casualty of war together with the inhabitants of the woods and the waves, so also Homo sapiens.

রক্তাক্ত প্রান্তরে ডানা ভাঙা শালিকের আর্তনাদ

যুদ্ধের ডাইরি লিখে যায়- এখানে কোনো বৃক্ষ এখন আর ছায়া দেয় না। 

পরিবেশ হলো যুদ্ধের সেই মৌন শিকার, যার আর্তনাদ কেউ শোনে না।

"পারমাণবিক যুদ্ধ যখন ব্যবসা"—এই কথাটি শুনলে মনে হতে পারে কোনো সাইন্স-ফিকশন সিনেমার প্লট, কিন্তু ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এর একটি অত্যন্ত বাস্তব এবং নিষ্ঠুর দিক রয়েছে। যখন যুদ্ধ বা যুদ্ধের হুমকি মুনাফা তৈরির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে আমরা যুদ্ধের ব্যবসা (War Profiteering) বা ভয় বিক্রির অর্থনীতি (Deterrence) ছাড়া আর কিবা বলতে পারি!!! ১৯৫০-১৯৮০ দশকে শীতল যুদ্ধের বিবর্তনে একটি ছদ্ম ধারণা (pseudo concept) প্রচলিত ছিল—"শান্তি বজায় রাখতে হলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।" এই ভয়কে পুঁজি করেই যুদ্ধের ঝুঁকি বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে প্রতিরক্ষা খাতে বিশ্বব্যাপী ব্যয় ২০২৪-২৫ সালে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে (সূত্র জাতিসংঘের সংবাদ https://news.un.org/en/story/2025/09/1165809)। আইসিএএন (International Campaign to Abolish Nuclear Weapons)-এর তথ্যমতে, পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো প্রতি মিনিটে প্রায় ১,৬০,০০০ ডলার খরচ করে মারণাস্ত্রের পেছনে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বা বিশ্ব ক্ষুধার মতো জ্বলন্ত  সমস্যা সমাধান করা সম্ভব ছিল। 

'রূপান্তরিত যুদ্ধ' (Transformative Warfare) অত্যাধুনিক যুগের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর [স্বীকৃত (পি৫) ও বহির্ভূত ৪] মধ্যে এমন এক  চাপান-উতোর রণকৌশল যেখানে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ [খুল্লাম খুল্লা সামরিক সংঘাত যেমন সাম্প্রতিককালে রাশিয়া বনাম ইউক্রেন] তথা মিত্র বা শত্রু পক্ষের মদতপুষ্ট ছায়াযুদ্ধ [ইসরায়েল (পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র) বনাম ইরান (পক্ষে রাশিয়া ও চীন) আসলে অমূল্য প্রাকৃতিক  সম্পদ (খনিজ তেল) ও প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া  আধিপত্য স্থাপনের লড়াই, যা কেবল প্রথাগত যুদ্ধাস্ত্র (রাইফেল, হ্যান্ড গ্রেনেড ও ল্যান্সার, কামান বা ট্যাঙ্ক, ফাইটার জেট, অ্যাপাচি, নৌবহর, অপারমাণবিক মিসাইল ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা) এবং সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রযুক্তির সাহায্যে দূরনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক, রাসায়নিক বা জৈবিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে বিশ্বের আর্থ-সামাজিক এবং পরিবেশ বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে। 

ছবিঃ ইউক্রেনের দক্ষিণে মাইকোলাইভ প্রদেশে কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় স্টেপ (steppe) অঞ্চলে মিসাইলের আঘাতে দাবানলের লেলিহান শিখায় জ্বলে খাক হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর অরণ্য  

সম্মিলিত অন্তহীন পাল্টাপাল্টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ যুদ্ধের আবহকে যেভাবে উন্মত্ত তান্ডবে পরিণত করেছে তাতে গোটা বিশ্ব অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রস্থ। সহজ কথায়, এই যুদ্ধ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ (5th Generation Warfare), যেখানে ভৌত আক্রমণের চেয়ে অ-গতিশীল বা মনস্তাত্ত্বিক, ডিজিটাল (Misinformation), সাইবার ও ছদ্মবেশী আক্রমণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বিনাশ ঘটিয়ে প্রতিপক্ষকে পঙ্গু করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলেছে। বর্তমানে যুদ্ধ কেবল মানুষ বা প্রাণী মারে না, বরং একটি অঞ্চলের পুরো বাস্তুসংস্থান (Ecosystem) ধ্বংস করে দেয়, যা আমরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য (সামরিক ও তৈলঘাঁটিতে এবং জ্বালানি পরিবহন রুটে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপ)-এ দেখছি বা ষাটের দশকে ভিয়েতনামে দেখেছি অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে বনভূমি পোড়ানো, জলাভূমি বিষাক্ত করা বা আবাদি জমি ধ্বংস করা যাতে শত্রুপক্ষের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেখানে বাস করতে না পারে। এই খেয়োখেয়িতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নির্বিবাদী মানুষ এবং অসহায় জীববৈচিত্র্য, যাদের সুরক্ষা নিয়ে কোনো যুযুধান পক্ষই মাথা ঘামাতে আগ্রহী নয়, যেখানে জাতিসংঘও কার্যত 'ঠুঁটো জগন্নাথ'।

ছবিঃ আফগানিস্তানে একটি আক্রমণকারী হেলিকপ্টার 

একবিংশ শতাব্দীর অবস্থান

২০২৬-এর পরিস্থিতি অনুযায়ী, বিশ্বে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতে পরিবেশের চিত্র ভয়াবহ। সংঘাতের সংখ্যা গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা (যেমন- Uppsala Conflict Data Program বা ACLED) এর তথ্যমতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৬টি থেকে ৬০টি দেশ কোনো না কোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে মাত্র ১১টি দেশ কোনো সংঘাতে জড়িত নয়।

১. ইউক্রেন-রাশিয়া 'ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ' (War of Attrition) (২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু)

প্রভাবিত এলাকা: প্রধানত পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস [দোনেৎস্ক (Pokrovsk-এর নিকটবর্তী এলাকা, Slovyansk-Kramatorsk-Kostiantynivka-র দক্ষিণ ও পূর্ব) ও লুহানস্ক)], দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চল। এছাড়া রাশিয়ার সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ এবং ক্রিমিয়া অঞ্চলেও নিয়মিত ড্রোন ও মিসাইল হামলা চলছে। ইউক্রেনের প্রায় ১৭ লক্ষ হেক্টর বনভূমি যুদ্ধ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত, যা দেশটির মোট বনভূমির প্রায় ১৫ শতাংশ।

২. মধ্যপ্রাচ্য (২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু)

গাজা উপত্যকা: প্রায় আড়াই বছর ধরে চলা যুদ্ধে গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি অভিযান এবং হামাসের প্রতিরোধ এখনও চলছে। এর ফলে প্রায় ৮৬% থেকে ৯৭% শস্যক্ষেত, ফলের বাগান এবং বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। সামরিক যানের চলাচল এবং বোমাবর্ষণের ফলে মাটির উপরিভাগ এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে সেখানে নতুন করে চাষাবাদ করা দুঃসাধ্য। কামানের গোলা ও মিসাইল থেকে নির্গত ভারী ধাতু (সীসা, পারদ, অ্যান্টিমনি) এবং সাদা ফসফরাসের অবশিষ্টাংশ মাটিকে বিষাক্ত করে তুলেছে। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন লাখ লাখ কিউবিক ফুট অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ায় দূষিত জলে মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়েছে। বিরল ভূমধ্যসাগরীয় সন্ন্যাসী সীল (Mediterranean monk seal Monachus monachus)-এর মতো প্রাণীরা এই অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ ওয়াদি গাজা (Wadi Gaza) জলাভূমির প্রায় ২৫% পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রায় ৬১ মিলিয়ন টন বিষাক্ত বর্জ্যের পাহাড় জমা হয়েছে।

লেবানন: দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৮০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি এবং কয়েক লাখ জলপাই গাছ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। লিটানি নদী (Litani River) এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তরগুলো বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ ও সামরিক বর্জ্যের কারণে দূষিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যবর্তী পরিযায়ী পাখিরা তাদের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করছে বা মাঝপথেই মারা যাচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলের শিয়াল, হায়েনা এবং বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। দাবানলের কারণে অনেক ধীরগতির প্রাণী জীবন্ত দগ্ধ হচ্ছে। বিষাক্ত ধোঁয়া এবং রাসায়নিকের কারণে মৌমাছির ঝাঁক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের পরাগায়ন (Pollination) প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।

ইরান ও প্রক্সি সংঘাত: ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যে সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা (Operation Epic Fury) ঘটেছে। অসংখ্য ইরানি যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যাওয়ায় সাগরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়েছে এবং লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত রাসায়নিক দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। সরাসরি ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার ফলে উভয় পক্ষেই বড় ধরণের সামরিক ক্ষতি এবং জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়েছে। ইরানের কুর্দিস্তান, লোরেস্তান এবং কেরমানশাহ অঞ্চলের বনাঞ্চলে এবং সংরক্ষিত এলাকায় হামলার ফলে বন্যপ্রাণীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মিসাইল হামলার ফলে সৃষ্ট দাবানলে পাহাড়ে কয়েকশ হেক্টর প্রাচীন ওক (Oak) বন পুড়ে গেছে। সেফিদকুহ রিজার্ভের মতো এলাকা থেকে হরিণ এবং বুনো ছাগলগুলো নিজেদের আবাসস্থল ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। পারস্য উপসাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ে মাছ ও সামুদ্রিক কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণীর মড়ক দেখা দিয়েছে।

বড় যুদ্ধের সবচেয়ে ক্ষতিকারক উপাদান

ক. ভ্যাকুয়াম বোমা, তাপ-চাপীয় অস্ত্র বা অ্যারোসল বোমা (Thermobaric & Cluster Munitions)

এই অস্ত্রগুলো বর্তমানে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রভাব: থার্মোবারিক বোমা বাতাস থেকে অক্সিজেন শুষে নিয়ে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে। এতে বনাঞ্চলের গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং মাটির গভীরে থাকা ছোট প্রাণী ও অণুজীবরা অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়।

মাটির ক্ষতি: ক্লাস্টার বোমার অবিস্ফোরিত অংশগুলো বছরের পর বছর মাটিতে পড়ে থাকে, যা বন্যপ্রাণীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায় এবং মাটির রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

খ. সাদা ফসফরাস ও রাসায়নিক অস্ত্র

সাদা ফসফরাস একটি অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক যা বাতাসের সংস্পর্শে এলে ৮০০°C পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি করতে পারে।

জৈববৈচিত্র্য বিনাশ: এটি কেবল ত্বক পোড়ায় না, বরং বনাঞ্চলে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটায় যা নেভানো প্রায় অসম্ভব। লোহিত সাগর বা উপকূলীয় অঞ্চলে এর ব্যবহারে জলজ প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং জলের অম্লতা (pH) বদলে যায়।

গ. আধুনিক নৌ-মাইন ও সোনার (Sonar) প্রযুক্তি

সমুদ্রের নিচে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের যম।

শব্দ দূষণ: সামরিক সাবমেরিনে ব্যবহৃত নিম্নকম্পাঙ্ক সক্রিয় সোনার (LFAS) শুশুক এবং তিমির মতো প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এটি ১,০০০ হার্টজ-এর নিচে কাজ করে। এর তীব্রতা উৎসের কাছে ২৩৫ থেকে ২৪০ ডেসিবেল (dB) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বাতাসে ২০০ ডেসিবেল একটি রকেট লঞ্চের শব্দের সমান। দেখা গেছে, এই সামুদ্রিক প্রাণীরা শব্দের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়:

১১০-১২০ ডেসিবেল: এই স্তর থেকেই নীল তিমি বা হাম্পব্যাক তিমিরা অস্বস্তি বোধ করে এবং এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে।

১৬০-১৮০ ডেসিবেল: এই মাত্রায় পৌঁছালে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা (Masking) সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। তারা নিজেদের দলের সদস্যদের সংকেত শুনতে পায় না, ফলে মা ও সন্তান আলাদা হয়ে যায়।

১৮০ ডেসিবেলের উপরে: এটি তিমির শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতি (Hearing Loss) করতে পারে।

অত্যন্ত উচ্চ ডেসিবেলে (২৩০+) তাদের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা ফুসফুস ফেটে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। জলের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এই শব্দ শত শত মাইল পর্যন্ত অত্যন্ত তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সোনারের ভয়ে গভীর সমুদ্রের তিমিরা যখন খুব দ্রুত জলের উপরে উঠে আসে, তখন তাদের শরীরে নাইট্রোজেন বুদবুদ তৈরি হয় (The Bends), যা তাদের মৃত্যুর কারণ। দিকভ্রান্ত হয়ে তারা সমুদ্রতটেও আটকে পড়ে (Stranding) এবং মারা যায়।

মাইন বিস্ফোরণ: সমুদ্রের তলদেশে পাতা মাইন বিস্ফোরণে প্রবাল প্রাচীর (Coral Reefs) ধ্বংস হয়, যা হাজার হাজার প্রজাতির রঙিন মাছ, যেমন—ক্লউনফিশ, প্যারটফিশ, ড্যামসেলফিশ এবং ব্যাটারফিশ, অমেরুদণ্ডী স্পঞ্জ, সি অ্যানিমোন, জেলিফিশ, কাঁকড়া, গলদা চিংড়ি এবং বিভিন্ন ধরণের শামুক ও ঝিনুক, একাইনোডার্মস [সমুদ্রের তারা (Starfish), সাগর আর্চিন এবং সামুদ্রিক শশা, সামুদ্রিক কচ্ছপ (৬টি প্রজাতি) এবং সাপ, বিভিন্ন প্রজাতির শক্ত ও নরম প্রবাল এবং অণুবীক্ষণিক শৈবাল (Zooxanthellae)]-এর আবাসস্থল।

ঘ. ড্রোন ও জিপিএস-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র

ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন বদলে দিলেও এটি বন্যপ্রাণীদের জন্য নতুন আতঙ্ক।

পরিযায়ী পাখির বিভ্রান্তি: ড্রোনের উচ্চ শব্দ এবং রেডিও সিগন্যাল পরিযায়ী পাখিদের নেভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায়। 

অগ্নিসংযোগ: এছাড়া ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম বনাঞ্চলেও নিখুঁতভাবে অগ্নিসংযোগ করা সম্ভব হচ্ছে, যা আগে কঠিন ছিল।

ঙ. সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম (Electronic Warfare)

এটি পরোক্ষভাবে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে। আধুনিক যুদ্ধে যখন বড় বড় বাঁধ বা পাওয়ার গ্রিড সাইবার আক্রমণের শিকার হয়, তখন কৃত্রিম বন্যা বা তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নির্গত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

৩. সুদানে সামরিক বাহিনী (SAF) এবং আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-এর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ (২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু) 

প্রভাবিত এলাকা: রাজধানী খার্তুম, দারফুর এবং কর্দোফান অঞ্চল।

৪. মিয়ানমার গৃহযুদ্ধ (২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু)

প্রভাবিত এলাকা: শান রাজ্য, রাখাইন রাজ্য এবং দেশের উত্তরাঞ্চল।

৫. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সংঘাত

ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া: লোহিত সাগরে বন্দর ব্যবহারের সুবিধা নিয়ে নতুন করে যুদ্ধের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

আফগানিস্তান-পাকিস্তান: সীমান্ত বিরোধ এবং টিটিপি (TTP) জঙ্গিদের কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তে নিয়মিত সংঘর্ষ চলছে।

সাহেল অঞ্চল (মালি, বুর্কিনা ফাসো, নাইজার)-এ আল-কায়েদা এবং আইএসআইএস (ISIS) সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর তান্ডব এবং গৃহযুদ্ধ আরও ভয়াবহ হয়েছে।

ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকা: ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং প্রতিবেশী গায়ানার সাথে সীমান্ত বিরোধ আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধ আসলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে একতরফা যুদ্ধ এবং নিঃশব্দ বিনাশ (Silent Extinction)। যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল দুই দেশের সীমান্তে ব্যাপক মানবজীবনহানি বা রাজনীতির মানচিত্র বদলে সীমাবদ্ধ থাকছে না, উদ্বেগজনকভাবে জল-বায়ু-মাটি দূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ও তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে। আধুনিক যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ধরণ পরিবর্তনের সাথে সাথে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষায়িত বনাঞ্চলগুলোও এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, আর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনকেও ত্বরান্বিত করছে এবং নিঃশব্দে মুছে দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা জীববৈচিত্র্যকে। বনের পুনর্জন্ম বা পুনর্গঠন কেবল গাছের ওপর নির্ভর করে না; বিবর্তনের ফলে মাটির গভীরে নির্দিষ্ট কিছু অণুজীব ও ছত্রাক তৈরি হয়েছে যা বনের পুনর্জন্ম নিশ্চিত করে, যেমন বনের আন্তৰ্জাল ছত্রাকের জালিকা (Mycorrhizal Fungi), নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী অণুজীব (Nitrogen-fixing Bacteria), স্যাপ্রোট্রফ বা এন্ডোফাইট। একটি সুস্থ বনের এক চা-চামচ মাটিতে প্রায় ১০০ কোটি ব্যাকটেরিয়া এবং কয়েক মাইল লম্বা ছত্রাকের জালিকা থাকতে পারে। দাবানল বা যুদ্ধের ফলে যখন বন ধ্বংস হয়, তখন এই মাটির নিচের অণুজীবগুলো যদি বেঁচে থাকে, তবে বন আবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তু আধুনিক মিসাইল ও গোলার অবশিষ্টাংশ (যেমন: হোয়াইট ফসফরাস, আরডিএক্স) থেকে রাসায়নিক দূষণ বা তেজস্ক্রিয়তা যদি এই অণুজীবদের মেরে ফেলে, তবে সেই বন আর কখনোই নিজে থেকে জন্ম নিতে পারে না, যাকে বিজ্ঞানীরা 'Ecological Dead Zone' বলছেন। এছাড়া যুদ্ধের কারণে বনের মাঝখানে রাস্তা, বাঙ্কার এবং মাইনফিল্ড তৈরি হওয়ায় বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে 'ইনব্রিডিং' বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে প্রজনন বাড়ছে, যা প্রজাতির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করছে।

ছবিঃ যখন ‘যুদ্ধ শেষ হয়’দাঁড়িয়ে থাকে মুক বধির কালো গাছগুলো যার প্রতিটি সবুজ পাতা আগুনে জ্বলে গেছে। প্রান্তর জুড়ে সবুজ শেষ। মাইলের পর মাইল কেবলমাত্র ধূসর ভাঙ্গা পাথরের সারি, যারা মৃত্যুর নীরব সাক্ষী। 

যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব (বোমাবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ) এবং পরোক্ষ প্রভাব (অবৈধ কাঠ কাটা, শরণার্থী শিবির স্থাপন)-এর ফলে প্রধানত চার ধরণের বন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে:

১. ক্রান্তীয় বৃষ্টিবন (Tropical Rainforests)

সাম্প্রতিক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল: কঙ্গো অববাহিকা (ডিআর কঙ্গো)=৫০ লক্ষ+ হেক্টর, আমাজন (কলম্বিয়া)= ৩০ লক্ষ+ হেক্টর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (মিয়ানমার)= বার্ষিক ৩-৪ লক্ষ হেক্টর; ঐতিহাসিক ভিয়েতনাম= ২০ লক্ষ হেক্টর।

ক্ষতির ধরণ: সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের যুদ্ধের খরচ মেটাতে অবৈধভাবে সেগুন ও মেহগনির মতো মূল্যবান কাঠ কেটে পাচার করে। এছাড়া গোরিলা এবং ওরাংওটাং-এর মতো প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে সেখানে খনি তৈরি করে।

২. বাদাবন (Mangrove Forests)

উপকূলীয় যুদ্ধ এবং নৌ-সংঘাতের প্রথম শিকার হয় নোনা জলের বন।

আক্রান্ত অঞ্চল: লোহিত সাগর উপকূল (ইয়েমেন), গাজা উপকূল এবং দক্ষিণ ভিয়েতনাম (ঐতিহাসিক)।

ক্ষতির ধরণ: সমুদ্রের তেলের ওপর ভাসমান আস্তরণ বাদা প্রজাতির শ্বাসমূল (Pneumatophores) বন্ধ করে দেয়, ফলে গাছগুলো শ্বাস নিতে না পেরে মারা যায়। এছাড়া উপকূলে সামরিক বাঙ্কার ও অবকাঠামো তৈরির জন্য এই বন উজাড় করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি: ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে যুদ্ধের কারণে বাদাবনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

৩. নাতিশীতোষ্ণ এবং পাইন বন (Temperate & Pine Forests)

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে ইউরোপের এই বনাঞ্চলগুলো এখন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

আক্রান্ত অঞ্চল: পূর্ব ইউক্রেন (ডনবাস অঞ্চল) এবং রাশিয়ার সীমান্ত এলাকা।

ক্ষতির ধরণ: আর্টিলারি শেলিং বা কামানের গোলার আঘাতে শুকনো পাইন বনে দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রায় ৩০ লক্ষ হেক্টর বনাঞ্চল যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিবেশগত ঝুঁকি: এই বনের মাটিতে কয়েক দশক ধরে জমে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড আগুনের ফলে বায়ুমণ্ডলে মিশে যাচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৪. শুষ্ক ও পর্ণমোচী বন (Dry & Deciduous Forests)

আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় এই বনগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আক্রান্ত অঞ্চল: সুদান, দক্ষিণ সুদান এবং ইথিওপিয়া।

ক্ষতির ধরণ: যুদ্ধের ফলে যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তখন স্থানীয় মানুষ এবং শরণার্থীরা রান্নার জ্বালানি হিসেবে এই বনের গাছ কাটতে বাধ্য হয়। এটি মরুভূমিকরণ (Desertification) প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

সর্বগ্রাসী যুদ্ধে আমাদের যে সংবেদনশীলতাগুলো সর্বপ্রথম বিসর্জিত হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো পরিবেশ সুরক্ষা। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি, কারণ এখনকার যুদ্ধগুলো সীমান্ত বা লোকালয় ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গহীন বনাঞ্চল ও দুর্গম পাহাড়ে। এইসব কারণে সশস্ত্র যুদ্ধ ও সংঘাত জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম প্রধান—এবং প্রায়শই উপেক্ষিত বা অবমূল্যায়িত—চালিকাশক্তি, যা বন্য আবাস ধ্বংস, দূষণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দূরপনেয় বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে (উপরের ছবি দ্রষ্টব্য)। 

 

বিংশ শতাব্দীর অবস্থান

১৯৫০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩৪টি অনন্য জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চল (Biodiversity Hotspots) বা উষ্ণকেন্দ্রের ৮১ শতাংশ (১৪৬টি সংঘাতের মধ্যে ১১৮টি) এলাকায় সরাসরি সশস্ত্র ও রাসায়নিক যুদ্ধ এবং সংঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে প্রকৃতির বুকে এক স্থায়ী দগদগে 'বাস্তুসংস্থানিক ক্ষত' (Ecological scar) রেখে গেছে। জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলের বাইরেও ১৪টি এলাকা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মানচিত্রঃ বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, সংঘাত ও সংঘর্ষপ্রবণ এলাকা (২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে সংজ্ঞায়িত)

সূচক:  বড় যুদ্ধ= ইউক্রেন-রাশিয়া ফ্রন্টলাইন, মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট অঞ্চল, সুদান (৫-৭%)   ছোটখাটো যুদ্ধ= মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ, ইথিওপিয়া, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল, সাহেল অঞ্চল (১২-১৫%)   সংঘাত প্রবণ এলাকা= দক্ষিণ চীন সাগর, ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-চীন সীমান্ত, কোরীয় উপদ্বীপ (২০-২৫%)  খণ্ডযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ= লাতিন আমেরিকার ড্রাগ কার্টেল এলাকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল (১৫-১৮%)।

১. বড় যুদ্ধ এলাকার প্রভাব (৫-৭%)

এই স্বল্প এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি রাসায়নিক অবক্ষয় এবং গণ-নিধন ঘটে চলেছে। ইউক্রেন বা সুদানের মতো অঞ্চলে মাটির গভীরে বোমার অবশিষ্টাংশ এবং বিষাক্ত ধাতু মিশে যাওয়ায় আগামী ১০০ বছরেও সেখানে অনেক উদ্ভিদ ও ক্ষুদ্র প্রাণী (Micro-fauna) ফিরে আসবে না।

২. ছোটখাটো যুদ্ধ ও খণ্ডযুদ্ধ (৩০%+ এলাকা)

এই এলাকাগুলোই আসলে জীববৈচিত্র্যের প্রধান ধারক ও বাহক। মায়ানমার বা কঙ্গোর মতো জায়গায় যেখানে গৃহযুদ্ধ চলে, সেখানে বন্যপ্রাণীরা সবচেয়ে বেশি 'দিশাহারা' হয়। কারণ এখানে প্রশাসনের নজরদারি থাকে না, ফলে চোরাশিকার এবং বন নিধন অবাধে চলে। একবিংশ শতাব্দীতে 'খণ্ডযুদ্ধ' এবং 'অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ' পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে অস্থির করে তুলেছে।

৩. সংঘাত প্রবণ ও সীমান্ত (২০%-২৫% এলাকা)

সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র না হলেও, এখানে সামরিক বাঙ্কার, কাঁটাতারের বেড়া এবং থার্মাল সেন্সরের কারণে বন্যপ্রাণীদের জেনেটিক করিডোর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যা হিমালয় বা পশ্চিম এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

প্রভাবিত জীববৈচিত্র্যের মূল্যায়ন

১৯৮৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে, বিশ্বজুড়ে ৪,২৯১টি স্থলচর স্তন্যপায়ী (৭৮ শতাংশ) ও ৯,০৫৬টি স্থলচর পাখি প্রজাতি (৮৫ শতাংশ) তাদের বিচরণক্ষেত্রে সশস্ত্র সংঘাতের সম্মুখীন হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ২২৫টি স্তন্যপায়ী এবং ৩৯০টি পাখি প্রজাতি (মোট ৬১৫টি প্রজাতি)-এর ক্ষেত্রে সংঘাত ছিল ব্যাপক কারণ সেগুলো ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। তবে আইইউসিএন (IUCN) লাল তালিকায় বৈশ্বিক প্রজাতি মূল্যায়ন মাত্র ১০৭টি প্রজাতিকে (৮৭টি স্তন্যপায়ী ও ২০টি পাখি) “যুদ্ধ, গৃহ-অস্থিরতা এবং সামরিক মহড়ার”কারণে হুমকির মুখে থাকা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সমস্ত প্রজাতি ধরলে, সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনায় বিপন্ন প্রজাতির গড় সংখ্যা ২,১৬৯। আসল সমস্যা যুদ্ধের আবহে 'সংরক্ষণ' (Conservation) সবসময়ই পেছনের সারিতে চলে যায়। যেসব দেশে দীর্ঘকাল যুদ্ধ চলেছে, সেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের হার প্রায় ৭০% কমে গেছে, কারণ বনরক্ষীদের হাতে অস্ত্র থাকলেও তারা বন্যপ্রাণ রক্ষার বদলে নয় পালাতে বা যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়।

১. প্রযুক্তিগত ও রাসায়নিক যুদ্ধ (Chemical Warfare) 

বিংশ শতাব্দীর সামনাসামনি যুদ্ধ (trench warfare)-এর চেয়ে উত্তরকালের 'প্রযুক্তিগত যুদ্ধ' (Technological Warfare) বন্যপ্রাণীদের জন্য অনেক বেশি মারাত্মক ও বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ উত্তরকালে রাসায়নিক (গ্যাস, তরল বা কঠিন বিষ) এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্ষতি যথেষ্ট বেড়েছে কারণ রাসায়নিক মানুষ ও প্রাণীদের সরাসরি আঘাত করে না, মাটি ও জলে মিশে যায় এবং বাতাসের বা সংস্পর্শের মাধ্যমে শরীরের ভেতর বিষক্রিয়া ঘটায় এবং কয়েক দশক ধরে সেই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র নষ্ট থাকে (ecocide), যা সহজে পুনরুদ্ধার করা যায় না। 

পরিবেশগত অবরোধ (Scorched Earth): ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৫) প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক কালো অধ্যায়। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে পরিচালিত এক সামরিক অভিযান (Operation Ranch Hand)-এ  মূলত ভিয়েতকং গেরিলাদের লুকানোর জায়গা ধ্বংস করতে এবং তাদের খাদ্যের উৎস (শস্যক্ষেত) নষ্ট করতে মার্কিন বাহিনী প্রায় ২ কোটি গ্যালন অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ডাইঅক্সিন (TCDD) যুক্ত ভেষজনাশক (Agent Orange) ব্যবহার করে ৩১ লক্ষ হেক্টর (প্রায় ৩০,০০০ বর্গ কিলোমিটার) ক্রান্তীয় বৃষ্টিবন ও উপকূলীয় বাদাবন ধ্বংস করে, যা এখন 'পরিবেশগত মরুভূমি'। দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রায় ৫০% বাদাবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এই বনগুলো সমুদ্রের ঢেউ থেকে উপকূল রক্ষা করত এবং মাছেদের প্রজনন কেন্দ্র ছিল। 

 

ছবিঃ ভিয়েতনামে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে ভেষজনাশক এজেন্ট অরেঞ্জ ছিটানো হচ্ছে।

এজেন্ট অরেঞ্জ কেবল গাছের পাতা ঝরিয়ে দেয়নি, বরং মাটির গভীরে বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিল। ঘন ক্রান্তীয় বনে এক সময় কয়েকশ প্রজাতির পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল। স্প্রে করার পর সেই জায়গাগুলো কেবল ঘাস ও আগাছায় ভরে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাখির সংখ্যা ৮০-৯০% কমে গিয়েছিল এবং ৭০% স্তন্যপায়ী প্রাণী (যেমন এশীয় হাতি, বাঘ, গিবন) এলাকাছাড়া হয়। মূলত বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে কয়েক লক্ষ বন্যপ্রাণী দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। ডাইঅক্সিন এমন একটি রাসায়নিক যা সহজে নষ্ট হয় না। এটি মাটির স্তর এবং জলাশয়ের তলানিতে জমা হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে, যা আজও ভিয়েতনামের প্রকৃতিতে বিদ্যমান। মাটির বিষক্রিয়ার ফলে ভিয়েতনামের অনেক অঞ্চলে আজও অনেক পাখি বা ছোটো স্তন্যপায়ী প্রাণী ফিরে আসেনি।

২. যুদ্ধে চোরাশিকারের অর্থনীতি

একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের ধরণ বদলেছে। এখনকার যুদ্ধগুলোতে বন্যপ্রাণী সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে 'পরোক্ষ শিকার' হিসেবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

ক. ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তুসংস্থান বদলে দিয়েছে।

মেসোপটেমীয় জলাভূমি (Mesopotamian Marshes): যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে এই বিশাল জলাভূমি ধ্বংস করা হয়। এর ফলে প্রায় ৪০টি প্রজাতির পাখি এবং বিপুল সংখ্যক উদবিড়াল (Otter) ওই অঞ্চল থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।

পারস্য তিতির (Persian Partridge): বোমাবর্ষণ এবং রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে উত্তর ইরান ও ইরাক সীমান্তে এই পাখিদের সংখ্যা প্রায় ৬০% কমে গিয়েছিল।

খ. ইরাক ও কুয়েত (উপসাগরীয় যুদ্ধ): ১৯৯১ সালে ইরাকি বাহিনী কুয়েতের ৭৩২টি তেলের কূপে আগুন ধরালে এবং শত শত তেলের ভালভ খুলে দিলে তেলকূপগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া আকাশকে এতটাই অন্ধকার করে দিয়েছিল যে, দিনের বেলাতেও কুয়েতের তাপমাত্রা ১০°C থেকে ১৫°C পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। তেলের ধোঁয়া ও ধূলিকণা মেঘের সাথে মিশে গিয়ে কুয়েত ছাড়িয়ে ইরান, পাকিস্তান এমনকি হিমালয় অঞ্চলেও 'কালো বৃষ্টি' হিসেবে ঝরে পড়েছিল। প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ টন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হয়েছিল, যা এসিড বৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ইরাকি বাহিনী প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগরে ঢেলে দিয়েছিল। এর ফলে সমুদ্রের উপরিভাগে প্রায় ৪ ইঞ্চি পুরু তেলের আস্তরণ তৈরি হয়েছিল, যা ৪০০ মাইলেরও বেশি উপকূলরেখাকে কলুষিত করে। এই ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় সমুদ্রের কচ্ছপ এবং পরিযায়ী পাখিদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। প্রায় ৩ লক্ষ সামুদ্রিক পাখি তেলের আস্তরণে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়। প্রবাল প্রাচীর এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুন নেভানোর পর দেখা যায়, প্রায় ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মরুভূমির বালুর ওপর জমে প্রায় ৩০০টি বিশাল তেলের হ্রদ তৈরি করেছে। তেলের কারণে মরুভূমির বালি পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায় ('Tarcrete') এবং গাছপালা জন্মানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এটি পরিযায়ী পাখিদের জন্য একটি 'মৃত্যুফাঁদ' হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তারা এগুলোকে জলাশয় মনে করে নামত এবং তেলের আঠায় আটকে মারা যেত। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে একক কোনো ঘটনায় সামুদ্রিক প্রাণী এবং পাখির মৃত্যুর অন্যতম বড় রেকর্ড।

 

ছবিঃ ১৯৯১ সালে কুয়েতে, উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, পশ্চাদপসরণকারী ইরাকি বাহিনীর তেলকূপগুলোতে অগ্নিসংযোগ (Environmental Terrorism) ও বিষাক্ত উত্তরাধিকার (Toxic Legacy)

গ. কঙ্গো ও মধ্য আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনী বন্যপ্রাণী শিকার করে অর্থ জোগাড় করে। কঙ্গোয় কেবল ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ হাতি চোরাশিকারিদের হাতে মারা যায় (দাঁতের বিনিময়ে অস্ত্র কেনার জন্য)। ২০ বছরে গরিলার সংখ্যা ৮০% কমেছে। ২০০৬ সালে মাত্র দুই মাসে, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মাই-মাই বিদ্রোহীরা ভিরুঙ্গার দু’টি নদীর প্রায় সমস্ত জলহস্তীকে হত্যা করে —যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ মানুষ ভিরুঙ্গা জাতীয় উদ্যানের প্রান্তে অবস্থিত শিবিরে বাস করত। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, রান্নার আগুন জ্বালানো এবং বিক্রির জন্য কাঠকয়লা তৈরির উদ্দেশ্যে দু’বছর ধরে প্রতিদিন উদ্যানটি থেকে প্রায় ১,০০০ টন কাঠ কাটা হতো। সংঘাত শেষ হওয়ার সময় নাগাদ ১০৫ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ৩৫ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছিল। এই পার্কটি মহাবিপন্ন পার্বত্য গরিলাদের পাশাপাশি শিম্পাঞ্জি, হাতি এবং অন্যান্য আকর্ষণীয় বৃহৎ প্রাণীদের আবাসস্থল। যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা ও হতাশার মধ্যে ভিরুঙ্গার মতো মূল্যবান বন্যপ্রাণী আবাসস্থলের সুরক্ষাব্যবস্থা বিলীন হয়ে যায়। তাই ১৯৯৪ সালে পার্কটি প্রথম বিপন্ন ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

ঘ. হিমালয় ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থল আফগানিস্তানে গত ৪০ বছরের যুদ্ধে অর্ধেকের বেশি বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে মূল্যবান পাইন ও দেশীয় পেস্তা বনও রয়েছে। এর ফলে খরা, মরুকরণ এবং বহু প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে। যুদ্ধের কারণে বালুচিস্তান ভালুক, পাহাড়ি ছাগল (Markhor), এশীয় চিতা, তুষার চিতা এবং কাস্পিয়ান বাঘ (যা ১৯৭০-এর দশকে বিলুপ্ত)-এর মতো প্রাণীরা তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বে তুষার চিতার ২০-২৫% বিচরণক্ষেত্র সরাসরি যুদ্ধ বা সীমান্ত উত্তেজনার কবল (চোরাশিকার, খাদ্য সংকট, রাসায়নিক ও শব্দদূষণ)-এ রয়েছে। আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে যাতায়াতকারী পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ৮৫ শতাংশ কমে গেছে, যেমন সাইবেরিয়ার সারস।

ঙ. একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক বিপর্যয় ঘটেছে ইউক্রেন (২০২২-বর্তমান)-এ, কৃষ্ণসাগরে প্রায় ৫০,০০০ শুশুক (Black Sea bottlenose dolphins, common dolphin, porpoises) মারা গেছে। সাধারণ সময়ে বছরে গুটিকয়েক ডলফিন মৃত অবস্থায় তীরে ভেসে আসে। কিন্তু যুদ্ধের সময় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট (Ecocide) হবার ফলে ইউক্রেন, তুরস্ক, বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়ার উপকূলে হাজার হাজার মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে। মনে করা হচ্ছে তীরে যতগুলো মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ডলফিন সমুদ্রে তলিয়ে গেছে, যা গণনায় আসেনি। নিচে এই বিপর্যয়-এর প্রধান কারণগুলো ব্যাখ্যা করা হলো:

১. সামরিক সোনার (Military Sonar)-এর ব্যবহার

বিহ্বলতা (Disorientation): রুশ যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনগুলো শক্তিশালী 'সোনার' ব্যবহার করে। শুশুকরা চলাফেরা এবং শিকারের জন্য শব্দের ওপর (Echolocation) নির্ভর করে। সোনারের উচ্চমাত্রার শব্দতরঙ্গ ডলফিনের শ্রবণশক্তি এবং দিকনির্ণয় ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। 

আতঙ্কে মৃত্যু: দিকভ্রান্ত হয়ে ডলফিনরা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অনেকে তীরের অগভীর জলে চলে আসে (Stranding), আবার অনেকে সমুদ্রে পাতা মাইনের ওপর গিয়ে পড়ে।

২. সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণ

কৃষ্ণসাগরে নিয়মিত মিসাইল হামলা এবং টর্পেডো বিস্ফোরণের ফলে জলের নিচে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপের কারণে শুশুকদের দেহের ভেতরের বায়ুথলি ফেটে যায় এবং তারা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে মারা যায়।

৩. রাসায়নিক দূষণ 

জাহাজ ডুবি এবং মিসাইল হামলার ফলে সাগরের জলে প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি তেল এবং রাসায়নিক মিশে যাবার ফলে শুশুকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৪. খাদ্য সংকট: যুদ্ধের কারণে মাছের ঝাঁক তাদের চিরচেনা বিচরণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে চলে যায়। সোনারের কারণে কানে আঘাত পাওয়া শুশুকরা আর নিজেরা খুঁজে শিকার করতে পারে না, ফলে তারা অনাহারে মারা যায়।

চ. গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে পরিযায়ী পাখি ও আবাসিক গবাদি পশুদের প্রাকৃতিক জলাভূমি ও খাদ্যভান্ডার ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যাপক বোমা বর্ষণ করে মেসোপটেমিয়ার ১৫,০০০ কিলোমিটার জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হয়েছে।

ছ. মিয়ানমার গৃহযুদ্ধ (১৯৬০-বর্তমান): কয়েক দশক ধরে চলা এই সংঘাতে মিয়ানমারের উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলের গভীর অরণ্যগুলো ধ্বংস হচ্ছে। সামরিক অভিযান ও বিদ্রোহীদের অর্থায়নের জন্য অবৈধভাবে কাঠ কাটা ও খনিজ উত্তোলনের ফলে লাল পান্ডা এবং এশীয় হাতির মতো প্রাণীরা হুমকির মুখে।

৩. যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব (War-induced Extinction)

অর্থনৈতিক ধস ও চোরাশিকার: যুদ্ধের সময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যায়। ফলে 'রেড ডাটা বুক'-এ থাকা প্রাণীদের চামড়া, হাড় বা দাঁতের জন্য চোরাশিকার বেড়ে যায় (যেমন কঙ্গোর হাতি)।

আমেরিকা ও ইরানের নৌ-বাহিনীর টহল এবং ড্রোন হামলার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত এবং সামুদ্রিক প্রাণী 'জলধেনু' বা 'সমুদ্রের গাভী' (Dugong) ও সামুদ্রিক কচ্ছপ ধ্বংস হয়েছে।

১. লোহিত সাগর (ইয়েমেন ও সুদান সংঘাত)

লোহিত সাগর ডুগংদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু ইয়েমেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক লোহিত সাগরে সামরিক তৎপরতা এদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও মাইন বিস্ফোরণ: সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে ডুগংদের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় সরাসরি বিস্ফোরণে এদের মৃত্যু ঘটে।

তেল নিঃসরণ (Oil Spills): যুদ্ধের কারণে তেলবাহী জাহাজে হামলা বা ডুবে যাওয়ার ফলে সমুদ্রে বিষাক্ত তেল ছড়িয়ে পড়ে। এটি ডুগংদের প্রধান খাদ্য সামুদ্রিক ঘাস ধ্বংস করে দিচ্ছে। উল্লেখ্য, একটি ডুগং দৈনিক প্রায় ৩০-৪০ কেজি ঘাস খায়। ইয়েমেন উপকূলের কাছে ডুগংদের সংখ্যা গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

২. পারস্য উপসাগর (আঞ্চলিক উত্তেজনা)

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডুগং আবাস পারস্য উপসাগর (বিশেষ করে কাতার, ইউএই এবং সৌদি আরব উপকূল) অঞ্চলে ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে ডুগং-এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

সামরিক মহড়া: এই অঞ্চলে নিয়মিত সামরিক জাহাজের চলাচল, মহড়া এবং তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা ডুগংদের শান্ত পরিবেশে বিঘ্ন ঘটায়। জাহাজের প্রপেলারের আঘাতে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডুগং মারা যায়।

রাসায়নিক দূষণ: যুদ্ধের প্রস্তুতি বা সংঘাতের ফলে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য সমুদ্রের জলের গুণমান নষ্ট করছে, যা ডুগংদের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

৩. ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ (কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগর)

সরাসরি ডুগং না হলেও, এই অঞ্চলের সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী [যেমন লম্বা চঞ্চু বড় শুশুক (Dolphin) ও ভোঁতামুখ ছোট শুশুক (Porpoise)] যুদ্ধের ভয়াবহ শিকার। তবে ডুগংদের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব হলো বিশ্বব্যাপী নৌ-চলাচলের রুট পরিবর্তন। যুদ্ধের কারণে অনেক বড় জাহাজ এখন বিকল্প নিরাপদ পথ হিসেবে ডুগংদের অভয়ারণ্যগুলোর ওপর দিয়ে চলাচল করছে, যা তাদের আবাসস্থলকে সংকীর্ণ করে তুলছে। 

ইউক্রেন যুদ্ধ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের পাশাপাশি কচ্ছপদের চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করছে।

আক্রান্ত প্রজাতি: বিরল কিছু সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজাতি যা কৃষ্ণ সাগরের উষ্ণ অংশে বিচরণ করে।

ক্ষতির কারণ: নৌ-মাইন ও বিস্ফোরণ: সমুদ্রের তলদেশে পুঁতে রাখা মাইন এবং গভীর সমুদ্রের বিস্ফোরণের ফলে কচ্ছপরা সরাসরি মারা যাচ্ছে অথবা গুরুতর আহত হয়ে তটে আটকে পড়ছে (Stranding)।

তেল নিঃসরণ: যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ থেকে নির্গত হাজার হাজার টন তেল কৃষ্ণ সাগরের উপরিভাগে আস্তরণ তৈরি করেছে, যা কচ্ছপদের শ্বাস নিতে বাধা দিচ্ছে এবং তাদের শরীরে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে।

৪. গাজা উপত্যকা ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল

গাজার দীর্ঘ উপকূলরেখা কচ্ছপদের ডিম পাড়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের কারণে এখানে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান প্রায় ধ্বংসের মুখে।

আক্রান্ত প্রজাতি: প্রধানত লগারহেড (Loggerhead) এবং সবুজ কচ্ছপ (Green Sea Turtle)।

খাদ্য সংকট: ২০২৪-২৫ সালের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গাজায় তীব্র দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে বিপন্ন সামুদ্রিক কচ্ছপ শিকার করে তাদের মাংস খাচ্ছে। স্থানীয় বাজারে কচ্ছপের মাংস প্রতি কেজি ৩০ ডলার বা তারও বেশি দামে বিক্রি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

উপকূলীয় ধ্বংসযজ্ঞ: অবিরাম বোমা বর্ষণ এবং উপকূলীয় অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে কচ্ছপদের ডিম পাড়ার চেনা সৈকতগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

দূষণ: সমুদ্রে অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন এবং গোলাবারুদের রাসায়নিক মিশে যাওয়ার ফলে কচ্ছপদের আবাসস্থল বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।

৫. লোহিত সাগর (ইয়েমেন ও আঞ্চলিক সংঘাত)

লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অঞ্চল, যা এখন যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

আক্রান্ত প্রজাতি: হকসবিল (Hawksbill) এবং সবুজ কচ্ছপ।

ক্ষতির কারণ: * জাহাজে হামলা: লোহিত সাগরে মালবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে রাসায়নিক এবং তেল নিঃসরণ ঘটছে, যা কচ্ছপদের প্রধান চারণভূমি (কোরাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক ঘাস) ধ্বংস করে দিচ্ছে।

শব্দ দূষণ: শক্তিশালী সোনার (Sonar) এবং সামরিক মহড়ার শব্দ কচ্ছপদের দিকভ্রান্ত করছে, যার ফলে তারা জাহাজ বা প্রপেলারের সাথে ধাক্কা খেয়ে মারা পড়ছে।

বিলুপ্তপ্রায় চিতা (Cheetah) 

বিশ্বের দ্রুততম স্থলচর প্রাণী হলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং এর ফলে সৃষ্ট আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে চিতা বিলুপ্তপ্রায়। 

১. এশীয় চিতা: ইরানের যুদ্ধ ও সীমান্ত উত্তেজনা

এক সময় ভারত থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত চিতা দেখা যেত, এখন তা কেবল ইরানের মরুভূমিতে সীমাবদ্ধ।

পরিসংখ্যান: গত এক দশকে ইরানে চিতার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে বন্য পরিবেশে মাত্র ১২ থেকে ২০টি এশীয় চিতা বেঁচে আছে বলে ধারণা করা হয়।

যুদ্ধের প্রভাব: ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই এদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শুরু হয়। বর্তমানে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং সীমান্ত এলাকায় সামরিক মহড়া, মাইন ফিল্ড এবং ড্রোন টহল চিতাগুলোর প্রজনন ও চলাচলে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে।

২. উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা: সাহারা অঞ্চলের চিতা

সাহারা মরুভূমি এবং এর আশেপাশের দেশগুলোতে (মালি, নাইজার, চাদ) চিতার অস্তিত্ব এখন সংকটে।

পরিসংখ্যান: এই অঞ্চলে চিতার সংখ্যা এখন ২৫০টিরও কম। মালির গৃহযুদ্ধ এবং আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কারণে এদের ওপর নজরদারি চালানো বা সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

শিকার ও ট্রাফিকিং: যুদ্ধের ডামাডোলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শখের জন্য চিতার বাচ্চা পাচার একটি লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কয়েকশ চিতার বাচ্চা অবৈধভাবে হর্ন অফ আফ্রিকা (সোমালিয়া) হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়।

৩. উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা (সুদান ও ইথিওপিয়া)

সুদানের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ চিতার জন্য একটি 'মৃত্যুফাঁদ' তৈরি করেছে।

পরিসংখ্যান: দক্ষিণ সুদান এবং ইথিওপিয়া সীমান্তে এক সময় চিতার বড় বিচরণক্ষেত্র ছিল। যুদ্ধের কারণে গত ৫ বছরে এই অঞ্চলে চিতার দেখা পাওয়া প্রায় বিরল হয়ে গেছে।

প্রভাব: যুদ্ধের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং সশস্ত্র বাহিনী চিতার প্রধান খাদ্য—হরিণ ও গাজেল (Gazella gazella)—শিকার করে খেয়ে ফেলছে। ফলে চিতাগুলো অনাহারে মারা যাচ্ছে অথবা লোকালয়ে এসে মানুষের হাতে প্রাণ দিচ্ছে।

কার্বন ফুটপ্রিন্ট বৃদ্ধি: বিশ্বজুড়ে সামরিক বাহিনীগুলো এককভাবে বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৫.৫% এর জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন টন কার্বন (CO2) নিঃসরণ হয়েছে বলে হিসেব করা হয়েছে। একটা F-35 ফাইটার জেট ১ ঘণ্টা ওড়াতে প্রায় ২৮,০০০ পাউন্ড CO2 নির্গত হয়। ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ট্যাঙ্ক এবং ব্র্যাডলি ফাইটিং ভেহিকলসহ প্রতি মাসে ১৯০.৮ মিলিয়ন লিটার তেল ব্যবহার করেছিল। আনুমানিক দুই-তৃতীয়াংশ যুদ্ধক্ষেত্রে যানবাহনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করতে ব্যবহৃত হয়।

পরিযায়ী পাখিদের পথের পরিবর্তন: যুদ্ধের শব্দ, বোমাবর্ষণ, ধোঁয়া এবং দূষণ পাখিদের হাজার বছরের পুরনো পরিযান রুট বদলে দিচ্ছে। অনেক পাখি বেপথু বা 'পরিবেশ- উদ্বাস্তু' (Ecological Refugees) হয়ে অন্য জায়গায় চলে গিয়ে বা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছে। নিচে সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে পরিযায়ী পাখিদের পথের পরিবর্তনের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর উল্লেখ করা হলো:

১. ইউক্রেন ও কৃষ্ণ সাগর অঞ্চল

বেলারুশ ও ইউক্রেন হয়ে আসা বড় গুটি ঈগল (Greater Spotted Eagle)-রা যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাগুলি এড়াতে বিশাল পথ ঘুরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। জিপিএস ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, আগে তারা যে পথে আসত, এখন তার চেয়ে গড়ে ৮৫ কিমি থেকে ২৫০ কিমি বেশি পথ পাড়ি দিচ্ছে। এছাড়া পাখিরা দীর্ঘ যাত্রায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য জলাভূমি ব্যবহার করে। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের অনেক জলাভূমি শুকিয়ে গেছে বা দূষিত হয়েছে, ফলে পাখিরা সেখানে না থেমে একটানা উড়ে যাচ্ছে, যা তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেক বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখির প্রজনন হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে কারণ তারা চেনা পথে তাদের জন্মস্থানে (natal area) ফিরতে পারছে না।

২. মধ্যপ্রাচ্য ও গাজা উপত্যকা

গাজা এবং লেবানন অঞ্চলটি উত্তর গোলার্ধ থেকে আফ্রিকায় যাওয়ার পথে পাখিদের জন্য একটি সরু কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পথ (Bottleneck)। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন এবং লেবানন সীমান্তের সংঘাতের কারণে বাতাসের কম্পন ও ধোঁয়ায় পাখিরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। অনেক পাখি এখন ভূমধ্যসাগরের উপর দিয়ে বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে অথবা তাদের যাত্রার সময় পিছিয়ে দিচ্ছে, যেমন সাদা সারস ও পেলিক্যানরা। যুদ্ধের সময় অনেক এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় পরিযায়ী পাখিদের অবৈধ শিকার বেড়ে গেছে, যা তাদের প্রথাগত পথ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে।

৩. সুদান ও লোহিত সাগর উপকূল

সুদানের গৃহযুদ্ধের ফলে লোহিত সাগর সংলগ্ন উপকূলীয় পথগুলো পাখিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

মাইন বিস্ফোরণ: কম্বোডিয়া বা অ্যাঙ্গোলার মতো দেশগুলোতে আজও মাটিতে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হাতির মতো বড় প্রাণীরা পঙ্গু হয়ে যায় বা মারা যায়।

 

আশাভরসা

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) অনুসারে, গত ৬০ বছরে সংঘটিত সকল অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অন্তত ৪০ শতাংশ প্রাকৃতিক সম্পদ (খনিজ তেল, কাঠ, হীরা, সোনা, অন্যান্য খনিজ সম্পদ, উর্বর কৃষিজমি এবং জল) শোষণের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু শান্তিকালীন সময়েও সামরিক বাহিনী প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলো যখন স্থানীয় সংরক্ষিত এলাকার কর্মীদের সহায়তা প্রদান করে এবং সংঘাতকালীন পুরো সময়জুড়ে সক্রিয় থাকে, তখন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমের উন্নতি ঘটে। 

যুদ্ধকালীন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বিপন্ন প্রাণীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্ধার করিডর স্থাপন; আহত বন্যপ্রাণীদের চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স; যুদ্ধক্ষেত্রের থেকে দূরে অস্থায়ী অভয়ারণ্য তৈরি; প্রশিক্ষিত কুকুর ও রোবট ব্যবহার করে বন্যপ্রাণীদের বিচরণক্ষেত্র থেকে ল্যান্ডমাইন অপসারণ, ইত্যাদি। 

যেহেতু জীববৈচিত্র্যের 'হটস্পট' বা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো মূলত রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এলাকাতেই কেন্দ্রীভূত, তাই সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়কে যুদ্ধের সময়গুলোতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে এবং বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সামরিক, পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোর সাথে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়টিকেও একীভূত করা উচিত।

যুদ্ধের ফলে জীবজগতের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা রোধ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু আইনি, প্রযুক্তিগত এবং নীতিগত ব্যবস্থা থাকলেও অনেক সময় শক্তিশালী দেশগুলো যুদ্ধের উত্তেজনায় এগুলো মেনে চলে না। ফলে আইনি ব্যবস্থার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং যুদ্ধের সময়ও পরিবেশের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করা।

ছবিঋণঃ আন্তর্জাল

 

 

0 Comments
Leave a reply