চিরকিরাৎ-এর গল্প

লিখেছেন:রানা গুপ্ত

 

১. 

সে আজ থেকে বহুবছর আগের কথা। এক পর্বতসস্কুল অঞ্চলের পাদমূলে চিরকিরাৎ নামেে একটা ছোট্ট গ্রাম ছিল। সেখানকার মানুষরা অত্যন্ত ধনী আর তাদের জীবন ছিল ভয়ানক উচ্ছৃঙ্খল - থেকে থেকে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি, হানাহানি, মারামারি, খুনোখুনি লেগেই থাকত আর বিলাসবহুলতাই ছিল তাদের জীবনের বেঁচে থাকার উদ্ভট উদ্দেশ্য। তাদের সব ছিল, ছিল না শুধু কোনো সেনাবাহিনী, তাই বাইরের দস্যুরা প্রায়শই পর্বতের ওপার থেকে এসে তাদের সম্পদ  লুটপাট করত, শত্রুরা শুধু জানত না মাটির নীচে এ দেশের খনিজসম্পদের হদিশ। একমাত্র গ্রামবাসীরাই সেকথা জানত, যা, বাইরের দুর্বৃত্তদের তারা কখনোই জানতে দিত না। 

গ্রামের দুই সুউচ্চ প্রত্যন্ত গুহাতে দুই কবি থাকতেন। কবি না বলে তাদের ঋষি বলাই ঠিক হবে। এঁদের মাঝে মাঝে দেখা যেত, যখন তাঁরা খাবার ও জলের সন্ধানে মাটিতে নেমে আসতেন। গ্রামের লোকজনেরা তাঁদের দেখত, কিছুটা সমীহ করত। তাঁদের দু'জনের দু'রকম ধারার কবিতা গ্রামবাসীদের হতবাক করতো কিন্তু কিছু বলতে বা জিজ্ঞাসা করতে তারা সাহস করতো না - গ্রামের বৃদ্ধদের মুখে শুনতো তাদের অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কথা, যা তাঁদের সত্যিই ছিল না। বৃদ্ধেরা আপ্রাণ চেষ্টা করতো গ্রামটার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে এই দু'জনের সম্পর্কে নানা ধরণের গল্প রটিয়েছিল তারা যার নিদর্শন তারা এদের কবিতায় দেখেছিল  - সে ধরণের কবিতা পড়ে গ্রামের মানুষগুলো বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়ত, কিন্তু নিজেরা তাদের স্বভাবচ্যুত হত না কখনোই – নিজেদের মধ্যে হানাহানি, কাড়াকাড়ি, মারামারি লাগিয়েই রাখতো। চারপাশের গ্রামগুলোও ততধিক সাংঘাতিক হয়ে উঠেছিল, যদিও এই দুই ঋষি-কবির কবিতা তাদের হাতেও পৌঁছত, তারাও শুনেছিলো তাদের অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কথা যা আসলে একমাত্র কবিতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। গ্রামের খবরাখবর দুই কবি বিলক্ষণ রাখতেন, দু’জনেই অত্যন্ত বিরূপ থাকতেন এ-ব্যাপারে , তাঁদের একজনের কবিতা ছিল স্বর্গীয় অন্যজনের নারকীয় – দু'জনেই একে অন্যের কবিতা পড়তেন, ভাবের আদান প্রদানও চলত। একের কবিতা পড়ে অন্যজন চেষ্টা করত কী করে কার কবিতা আরো উন্নত করা যায়। একজনের কবিতায় থাকত মণিমুক্তো ছড়ানো শব্দাবলী, উপমা, প্রতীকী অন্যজনের কবিতায় শুধুই অন্ধকার, মৃত্যু আর হত্যার ভয়ঙ্কর সব পংক্তি। দুজনেই আপ্রাণ চেষ্টা করতো ভাল-মন্দের সমন্বয়ে এক সামঞ্জস্য আনতে, যাতে করে গ্রামের উদভ্রান্ত, উচ্ছৃঙ্খল মানুষগুলো সঠিক পথের দিশা পায় তাদের জীবনে। কিন্তু বারবারই তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হত। একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে দুজনে পর্বতের পাদমূলে হাজির হল – স্বাভাবিক ভাবেই তাদের দুজনের চোখে মুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ, গ্রামটাকে তারা ভালোবেসেছিল, বিশেষত তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য। মানুষগুলোকে নিয়ে কিছু কম চিন্তা ছিল না, কেননা তাঁরা গ্রামটাকে ছেড়ে যেতে চায়নি, যা ইচ্ছে করলেই তাঁরা চলে যেতে পারতো। আসলে তাঁরা তাঁদের অকল্পনীয় কবি প্রতিভার গুণেই বেঁচেছিল। একে অন্যের কবি প্রতিভাকে সম্মান করতো। একের কবিতা অন্যকে উৎসাহিত করতো, যা তারা পরস্পরকে জানাতো। ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার, জন্ম-মৃত্যুর মত তাঁদের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। সন্ধ্যার অন্ধকারে অনেক আলোচনার পর তাঁরা এই সিদ্ধান্ত হল যে তাঁরা দুজনাই গ্রাম ছেড়ে আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিষ্ক্রান্ত হবে। সেখানে গ্রামের দুদিকে দুটো পরিত্যক্ত জীর্ণ গ্রন্থাগার আছে, আয়তনে নেহাত কম নয় এবং সেখানেই তারা বছর দশেক অধ্যয়ন করবে, কিন্তু কবিতার ধারা বদল হবে, দুজনেই অন্ধকারের কবিতা লিখবে - অন্ধকারতম কবিতাবলী - একজন চর্চা করবে নর-নারীর সম্পর্ক, ভালোবাসা, প্রেম ইত্যাদির, অন্যজনের বিষয় হবে সমাজ, সময় সভ্যতা নিয়ে, কিন্তু তাঁদের কবিতা হবে চূড়ান্ত কেওটিক, ভয়ঙ্কর - যেখানে কোনরকম আলোর প্রবেশ থাকবে না, থাকবে শুধুই অন্ধকার আর ভয়াবহতা, যা হবে ভবিষ্যতের বার্তাবহ, যা গ্রামের মানুষদের শুধু নিদারুণ ভয় দেখাবে, আর মহাতঙ্কে আচ্ছন্ন করবে। এই প্রত্যয় নিয়ে তারা দুজনে যাত্রা শুরু করলো, একজন উত্তরে, অন্যজন দক্ষিণে – উদ্দেশ্য গ্রামটার আমূল বদল - মানুষদের চিন্তা চেতনার আমূল বদল। শুরু হল তাঁদের একাগ্র অধ্যয়ন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হতে থাকল – আর তারই মধ্যে চলতে থাকল তাদের আলাপ - আলোচনা, বিতর্ক, আর এরই মধ্যে দিয়ে তারা ধীরে ধীরে তাদের ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে থাকলো।

দশ বছর দীর্ঘ অধ্যয়নের পর তাঁরা ফিরে এসেছিল গ্রামটায়। কঠোর মানসিক পরিশ্রমে তাঁদের দুজনেরই শরীর ভেঙে পড়েছিল, শুধু উস্কোখুস্কো চুল-দাড়ির মধ্যে তাঁদের চোখদুটো থেকে সুতীব্র এবং সুতীক্ষ্ণ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল থেকে থেকে। গ্রামটার দিকে তাকিয়ে তারা মনে মনে হাসলো। দেখলো গ্রামটার কোন উনিশ- বিশ হয়নি আর তার বাসিন্দারাও ঠিক আগের মতই রয়ে গেছে।  রাত্রে লিখতে বসার সময় মশালের আলোয় তাঁদের মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করল, রগের শিরা ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো। শুরু হল ইভিলের সাধনা কবিতায়, চূড়ান্ত ইভিলকে জাগানোর চূড়ান্ত সাধনা। তাঁদের কাব্য অশনি ঝরাতে শুরু করলো অক্ষরে অক্ষরে। তাঁদের দার্শনিক চার-চোখে শুধুই আগুনের লেলিহান শিখা। টানা ছয়মাস ধরে চললো কাব্য চর্চার এই ভয়ানক অধ্যায়। ধীরে ধীরে তারা শান্ত সমাহিত হলেন - শরীর, মন আত্মায় নেমে এল পরম শান্তি। অতি কম সময়ের মধ্যেই তাঁদের কবিতা ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের ঘরে ঘরে, সমগ্র চিরকিরাৎ-এ। প্রথম প্রথম গ্রামের লোকেরা তাদের কবিতা পড়ে তেমন কিছু বুঝতে পারছিল না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিল যে, তারা ভয়ঙ্কর আতঙ্কজনক, এমন কী রক্ত ঠান্ডা মেরে যাওয়া কিছু পড়ছে — গোটা গ্রামটাই নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে পড়ে চলল সে সমস্ত অকল্পনীয় নির্মম কবিতা, তাদের মাথা খারাপ হতে বসেছিল, তবু তারা কবিতা পড়া ছাড়তে পারছিল না, কবিতার আকর্ষণ অমোঘ ছিল। ভয়ে আতঙ্কে শিহরিত হতে হতেও তারা পড়ে চলেছিল এই সমস্ত আগুন ঝরা কবিতা। তাতে করে তাদের মাথায়, চেতনায় ভয়ঙ্কর ঝড় উঠলো।

তারা স্মরণ করলো চিরকিরাৎ -এর অতীত ঐতিয্যের কথা, তা যেমন রোমহর্ষক, তেমনই শ্রবণীয়, মধুর। প্রকৃতপক্ষে কতই না মহতী প্রাণের আশ্রয় ছিল গ্রামটায়- শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতিতে কতই না এগিয়েছিল সময়ের থেকে, যা তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে আবারও এবং এহেন কর্মসম্পাদনে তাদেরকে অনেক পরিশ্রম অনেক অধ্যয়ন, কৃচ্ছসাধনও করতে হবে একমাত্র সেটার ভিতর দিয়েই চিরকিরাৎ-এর অতীত গৌরব ফিরে আসবে, নচেৎ যে বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে তারা চলেছে তা ক্রমাগত চলতে থাকলে দু'তিন প্রজন্মের মধ্যেই সব কিছু শেষ হয়ে যাবে; তাদের অস্তিত্ব যন্ত্রণায়, কষ্টে, অসুখে-বিসুখে, অনাহারে অর্ধাহারে, অবহেলায় মাটিতে মিশে যাবে, অন্যেরা এসে অধিকার করবে তাদের গ্রাম, গোটা গ্রামটাই হাতছাড়া হয়ে পড়বে- তখন তাদের জীবনে নিরন্তর দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। বৃদ্ধরা তাদের এই বলে আশ্বস্ত করল সে চিরকিরাৎ- তাদের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে তারা যতটুকু জানে, তাদের জীবনের বাকি সময়টা তারা সেই শিক্ষায়-ই তাদের সমৃদ্ধ করবে, যদি তারা প্রকৃতপক্ষেই সেই কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে চায় এগিয়ে যাওয়ার কাজটা হবে তাদেরই। এই কথা শুনে অনেকেই চিন্তিত মুখে তাদের কাছে এগিয়ে এল, তাদের দু'হাত মাথায় ঠেকালো... বৃদ্ধদের মুখেও হাসি ফিরে এলো, ধীরে ধীরে নতুন কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। তাদের মনের মধ্যে বৃদ্ধদের কথাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকলো- না, যে কোনোভাবেই চিরকিরাৎ-এর অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে- এই সম্পর্কে দৃঢ়চিন্ত হল, দৃঢ় সঙ্কল্প হল ... তাদের কথা অনান্য গ্রামেও পৌঁছল এবং তারাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে শুরু করল। বৃদ্ধদের মুখে চিরকিরাৎ-এর এহেন পরিবর্তনের কথা দুই কবি-ঋষির কানে পৌঁছালো, তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। আনন্দে বৃদ্ধদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। চিরিকিরাৎ-এর বহু বছরের প্রার্থিত শান্তি ফিরে এল, শুধু আশ্চর্য ব্যাপার এই যে এই দুই কবি-ঋষিকে চিরাকিরাৎ - এ আর কোনদিন দেখা গেল না।

 

0 Comments
Leave a reply