পৃথিবীর সমস্ত ভাষার শব্দকোষে যদি সবচেয়ে পবিত্র ও সুন্দর কোনো শব্দ থাকে, তবে তা হলো — ‘শান্তি’। এটি একটি চিরকালীন এবং সর্বকল্যাণকারী শব্দ, যা প্রতিটি জীবের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা। প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতীয় জনমানসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে যজুর্বেদের সেই অমোঘ শান্তি পাঠ: ওঁ দ্যৌঃ শান্তীরন্তরিক্ষং শান্তি, পৃথিবী শান্তিরাপাঃ শান্তিরোষধয়ঃ শান্তিঃ। বনস্পতয়ঃ শান্তির্বিশ্বে দেবাঃ শান্তির্ভ্রমহ্ম শান্তিঃ, সর্ব শান্তিঃ, শান্তিরেভ শান্তিঃ, সা মা শান্তিরেধি।। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।— এই প্রার্থনা কেবল স্বর্গ বা মর্ত্যের জন্য নয়; বরং জল, ওষধি, বনস্পতি এবং ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি অণুর জন্য এক শাশ্বত কল্যাণ কামনা, শান্তি প্রার্থনা।
শান্তির ঠিক বিপরীত শব্দটি হলো — ‘যুদ্ধ’। শান্তির চিরকালীন কামনার সমান্তরালে যুদ্ধ মানুষের এমন এক বর্বর প্রবৃত্তি হিসেবে টিকে আছে, যা কেবল শরীর ধ্বংস করে না, বরং অস্তিত্বের প্রতিটি উপাদানকে দূষিত করে। যুদ্ধে ন্যায়-অন্যায় আর উচিত-অনুচিতের সীমারেখা এমনভাবে মুছে যায় যে অমানবিক পশুর মতো আচরণ করাই তখন দস্তুর হয়ে দাঁড়ায়। নগরের বুকে তখন সমুদ্র বা জঙ্গলের সেই আদিম ব্যাকরণ — ‘জোর যার মুলুক তার’—সাকার হয়ে ওঠে। এই কারণেই রোমান দার্শনিক সিসারো (১০৬ খ্রিষ্টপূর্ব) বলেছিলেন, “I prefer the most unfair peace to the most righteous war.” (আমি অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধের তুলনায় অত্যন্ত অন্যায় শান্তিকেও অগ্রাধিকার দেব।)
কোনো যুদ্ধই অনন্তকাল ধরে চলে না এবং প্রতিটি যুদ্ধের শেষ হয় চুক্তির মাধ্যমে। তাহলে যুদ্ধ কেন হয়? ভারতীয় সাংখ্য দর্শন মতে মানুষের ভেতরের ‘তম’ গুণের বহিঃপ্রকাশই হলো এই হিংসা, যা অহংকার, কাম ও ক্রোধের আশ্রয়ে যুদ্ধকে জিইয়ে রাখে। অন্যদিকে মানুষের ‘সত্ত্ব’ গুণের আধার – প্রেম, করুণা ও ক্ষমার বোধই যুদ্ধের বিরুদ্ধে মানবিক সত্তার নিরন্তর লড়াইকে জারি রাখে।
ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধের প্রকৃতি বিবর্তিত হতে হতে আজ এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় মহাভারতের মতো মহাকাব্যে ধর্মের জন্য যুদ্ধের অপরিহার্যতা দেখানো হলেও, ‘শান্তিপর্বে’র মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের চরম নিরর্থকতা ও বিভীষিকাকেই পরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আধুনিক যুগে মহাত্মা গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক সত্যাগ্রহের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, অহিংসা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি এক সৃজনশীল মহাশক্তি। আজীবন অহিংসার ব্যবহারিক প্রয়োগ করার পরও গান্ধী বলতেন, “অহিংসার মধ্যে আর কত শক্তি লুকিয়ে আছে, তা আমি আজও পুরোপুরি খুঁজে পাইনি”।
নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সে বসে লেখা ‘লেটারস টু আ জার্মান ফ্রেন্ড’-এ আলবেয়ার ক্যামু যুদ্ধের এক চরম নৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধ এক চূড়ান্ত ‘অসংগতি’ বা ‘Absurdity’, যা মানুষের অর্জিত সমস্ত মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনের অর্থকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ক্যামু অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করেছিলেন যে, যুদ্ধের ভয়াবহতা শান্তিকামী মানুষকেও শেষপর্যন্ত ‘খুনি’ হতে বাধ্য করে — কেবল রক্তপাত থামানোর তাগিদে। এই যে মানুষের মহত্তম সত্তার বিসর্জন, একেই তিনি মানবাত্মার গভীরতম ট্র্যাজেডি বলে গণ্য করেছেন। ক্যামু বিশ্বাস করতেন, এই মহাবিশ্বের হয়তো কোনো পরম সার্থকতা নেই, কিন্তু এই জগতের একটি জিনিসের অর্থ নিশ্চিতভাবেই আছে—আর তা হলো ‘মানুষ’। কারণ মানুষই একমাত্র সত্তা যে জীবনের একটি অর্থ খুঁজে পাওয়ার জেদ ধরে থাকে। তাই নিয়তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানুষের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা প্রমাণ করাই আমাদের একমাত্র কাজ। মানুষের অস্তিত্ব যদি বিপন্ন হয়, তবে জীবনের মূল আদর্শটুকুও চিরতরে হারিয়ে যাবে। অর্থাৎ, জীবনের চেতনাকে বাঁচাতে হলে সর্বাগ্রে মানুষকে রক্ষা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
জাতীয়তাবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া বক্তৃতাগুলো আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। তাঁর দৃষ্টিতে বিমূর্ত ‘নেশন’ বা রাষ্ট্র যখন একটি আত্মহীন বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত হয়, তখনই দেশপ্রেমের ছদ্মবেশে মানুষের লোভ যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি এবং বাণিজ্যের এই সংগঠনগুলো যখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন মানুষের মহত্তর প্রবৃত্তিগুলো একপাশে সরিয়ে রাখা হয়। এই যান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো মানুষের মহত্তম সত্তাকে পিষ্ট করে এক ভয়ের পরিবেশ আর সন্দেহের বীজ বপন করে।
বর্তমানের যুদ্ধ আর কেবল বীরত্বের বা ভূখণ্ডের লড়াই নয়, তা এক জ্যামিতিক নিষ্ঠুরতায় পর্যবসিত হয়েছে। প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ, রাশিদ খালীদি তাঁর পর্যবেক্ষণে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের আস্ফালন নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস ও ভূখণ্ডের সঙ্গে তাদের নাড়ির সম্পর্ককে মুছে ফেলার এক দীর্ঘমেয়াদী নীলনকশা। খালীদির মতে, যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি কেবল অবকাঠামোর ধ্বংস নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের ঘরেই ‘ছায়া’ বা ‘প্রেতাত্মায়’ পরিণত করার এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য হলো একটি জাতির স্মৃতির শিকড় উপড়ে ফেলা এবং তাদের অস্তিত্বকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা। আজকের এই সংঘাতগুলো কেবল মানচিত্রে বিজয়ীর নাম লেখে না, বরং তারা সুকৌশলে একটি জনপদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে পদ্ধতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।
বর্তমানের এই ‘গ্রেট ডিহিউম্যানাইজেশন’ বা অমানবিকীকরণের যুগে রণক্ষেত্র এখন আর কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়, তা প্রতিটি মানুষের বসতভিটে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। যুদ্ধ যান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত অ্যালগরিদম আজ নির্ধারণ করে দিচ্ছে কার মৃত্যু হবে, কার নয়। এই যান্ত্রিকতা হত্যার নৈতিক দায়বদ্ধতাকে একটি ডিজিটাল ঢালের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে শত্রুকে রক্ত-মাংসের মানুষের বদলে নিছক একটি ‘ডেটা পয়েন্টে’ পরিণত করে। আজ যুদ্ধের নব্বই শতাংশ হতাহতই সাধারণ নাগরিক, যার ফলে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে কেবল মানুষ নয়, বরং হারিয়ে যাচ্ছে ‘ইয়ার্স অফ লাইফ লস্ট’ বা লক্ষ লক্ষ জীবন-বছর।একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণের বিনাশ নয়, বরং আগামী কয়েক দশকের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অকাল সম্ভাবনা মুছে যাওয়া।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে – ‘নিউ স্টার্ট’ (New START- Strategic Arms Reduction Treaty) -বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির অবসান, আমাদের এক নীতিহীন পৃথিবীতে ঠেলে দিয়েছে যেখানে হাসপাতাল বা শস্যক্ষেত্র ধ্বংস করাও রণকৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা প্রবেশ করেছি এক ‘উত্তর-আদর্শিক’ (Post-Normative) বিশ্বে, যেখানে যুদ্ধের নিয়মগুলো ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নয়, বরং শক্তির দাপটে নতুন করে লেখা হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে, আধুনিক যুদ্ধ কোনো পক্ষকেই বিজয়ী করে না, বরং এক অন্তহীন অচলাবস্থা তৈরি করে। আজ ক্ষুধাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, স্কুল-হাসপাতাল হয়ে উঠছে সামরিক লক্ষ্যবস্তু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ন্যায়-অন্যায়ের অভিন্ন ভাষাটি হারিয়ে ফেলেছে। সীমানার ওপারে থাকা কোনো শিশুর জীবনের পবিত্রতা আজ আমাদের স্পর্শ করে না। সর্বজনীন এই নীতিগুলোর ভেঙে পড়াই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা, যা পারমাণবিক যুদ্ধের ছায়াকে ফিরিয়ে আনছে আর কোটি কোটি মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। ২০২৬-এর এই যুদ্ধ কোনো ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ নয়, বরং এক চূর্ণ-বিচূর্ণ বিশৃঙ্খলা; যার প্রতিধ্বনি শোনা যায় সুদানের বাস্তুচ্যুত মায়ের নীরবতায় কিংবা ‘ডম্বিসাইড’ (Dombicide) বা পরিকল্পিত গৃহহীনকরণের অমানবিকতায়। গাজা থেকে বৈরুত, ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েলের রণাঙ্গন, কিংবা লেবানান; সবখানেই ক্ষমতার এই নীতিবিহীন উলঙ্গ প্রদর্শন আজ সভ্যতার মুখচ্ছবিকে ম্লান করে দিচ্ছে।
আমাদের সময়ের যুদ্ধ মূলত মানুষের কল্পনাশক্তির পরাজয়। জঁ পল সার্ত্রের ভাষায়, শব্দই হলো হিংসার বিকল্প; যখন সংলাপের ক্ষমতা ফুরিয়ে যায় তখনই অস্ত্রের গর্জন শুরু হয়। যদি এই সংঘাতের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয় ‘অপর’কে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা, তবে এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বিপরীতে সৃজনশীল লেখকরাই শব্দের শক্তিতে প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তুলতে পারেন। সংবেদনশীল কবি ও লেখকরা শব্দের সত্তায় বিশ্বাস রাখেন বলেই তাঁরা আজও পৃথিবীর পিছু ধাওয়া করা এই যুদ্ধের উন্মাদনাকে রুখতে চান। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন—এই সীমানা কে তৈরি করল? কে শেখায় এই হিংস্র খেলা? আর এই জয়ে শেষ পর্যন্ত লাভ কার? যুদ্ধক্ষেত্রের নিস্প্রাণ পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষের মুখাবয়বকে ফিরিয়ে আনা এবং যে শোককে পৃথিবী উপেক্ষা করতে চাইছে, তাকে শব্দের মাধ্যমে মূর্ত করাই এখন তাঁদের প্রধান কাজ।অহিংসা আজ কেবল একটি আদর্শ নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার শেষ উপায় - অহিংসাই মানুষের পরম ধর্ম এবং একমাত্র বরণীয় পথ।
