আত্মচরিত

লিখেছেন:শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ছেলেবেলার কথা মনে আছে। পাড়াগাঁয়ে মাছ ধরে, ডোঙা ঠেলে, নৌকা বেয়ে দিন কাটে, বৈচিত্র্যের লোভে মাঝে মাঝে যাত্রার দলে সাগরেদি করি, তার আনন্দ ও আরাম যখন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন গামছা কাধে নিরুদ্দেশযাত্রায় বার হই। ঠিক বিশ্বকবির কাব্যের নিরুদ্দেশযাত্রা নয়, একটু আলাদা। সেটা শেষ হলে আবার একদিন ক্ষতবিক্ষত পায়ে নির্জীব দেহে ঘরে ফিরে আসি। আদর-অভ্যর্থনার পালা শেষ হলে অভিভাবকেরা পুনরায় বিদ্যালয়ে চালান ক'রে দেন। সেখানে আর এক দফা সম্বর্ধনা লাভের পর আবার বোধোদয়, পদ্যপাঠে মনোনিবেশ করি। আবার একদিন প্রতিজ্ঞা ভুলি, আবার দুষ্ট সরস্বতী কাধে চাপে, আবার সাগরেদি সুরু করি, আবার নিরুদ্দেশযাত্রা, আবার ফিরে আসা, আবার তেমনি তাদের আপ্যায়ন সন্ধর্ধনার ঘটা - এমনি ক'রে বোধোদয়, পদ্যপাঠ ও বাল্যজীবনের এক অধ্যায় সমাপ্ত হ'ল।

এলাম সহরে, একমাত্র বোধোদয়ের নজিরে গুরুজনেরা ভর্তি ক'রে দিলেন ছাত্রবৃত্তি ক্লাসে; তার পাঠ্য- সীতার বনবাস, চারুপাঠ, সদ্ভাবশতক ও মস্ত মোটা ব্যাকরণ। এ শুধু পড়ে যাওয়া নয়, মাসিকে সাপ্তাহিকে সমালোচনা লেখা নয়, এ পণ্ডিতের কাছে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিদিন পরীক্ষা দেওয়া। সুতরাং অসঙ্কোচে বলা চলে যে, সাহিত্যের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটলো চোখের জলে। তার পরে সুখ দুঃখে আর একদিন সে মেয়াদও কাটলো। তখন ধারণাও ছিল না যে, মানুষকে দুঃখ দেওয়া ছাড়া সাহিত্যের আর কোন উদ্দেশ্য আছে।

যে পরিবারে আমি মানুষ, সেখানে কাব্য উপন্যাস দুর্নীতির নামান্তর, সঙ্গীত অস্পৃশ্য সেখানে সবাই চায় পাশ করতে, এবং উকীল হতে। এরি মাঝখানে আমার দিন কেটে চলে। কিন্তু হঠাৎ একদিন এর মাঝেও বিপর্যয় ঘটলো। আমার এক আত্মীয় তখন বিদেশ থেকে মেয়েদের জড় ক'রে তিনি একদিন পড়ে শোনালেন রবীন্দ্রনাথের ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’। কে কতটা বুঝলে জানিনে কিন্তু যিনি পড়ছিলেন তার সঙ্গে আমার চোখেও জল এল। কিন্তু পাছে দুর্বলতা প্রকাশপায়, এই লজ্জায় তাড়াতাড়ি বাইরে চলে এলাম। কিন্তু কাব্যের সঙ্গে দ্বিতীয় বার  পরিচয় ঘটলো, এবং বেশ মনে পড়ে এইবারে পেলাম তার প্রথম সত্য  পরিচয়। এর পরে এ বাড়ির উকীল হবার কঠোর নিয়ম-সংযম আর ধাতে সইল না; আবার ফিরতে হলো আমাদের সেই পুরোন পল্লি ভবনে। কিন্তু এবার আর বোধদয় নয়, বাবার ভাঙা দেরাজ থেকে খুঁজে বের করলাম ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ আর বেরোল ‘ভবানী পাঠক’। গুরুজনদের দোষ দিতে পারিনে, স্কুলে পাঠ্য তো নয়, ওগুলো বদছেলের অপাঠ্য পুস্তক। তাই পড়বার ঠাই ক'রে নিতে হ'লো আমাকে বাড়ির গোয়ালঘরে। সেখানে আমি পড়ি, তারা শোনে। এখন আর পড়িনে, লিখি। সেগুলো কারা পড়ে জানিনে। একই স্কুলে বেশী দিন পড়লে বিদ্যা হয় না, মাস্টারমশাই স্নেহবশে একদিন এই ইঙ্গিতটুকু দিলেন। অতএব আবার ফিরতে হল সহরে। বলা ভাল, এর পরে আর স্কুল বদলাবার প্রয়োজন হয়নি। এরপর খবর পেলাম বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলীর। উপন্যাস-সাহিত্য ধারাবাহিক এর পরেও যে কিছু আছে তখন ভাবতেও পারতাম না। পড়ে পড়ে বইগুলো যেন মুখস্থ হ'য়ে গেল। বোধ হয়, এ আমার একটা দোষ। অন্ধ অনুকরণের চেষ্টা না করেছি যে নয়; লেখার দিক দিয়ে সেগুলো একেবারে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু চেষ্টার দিক দিয়ে তার সঞ্চয় মনের মধ্যে আজও অনুভব করি।

তার পরে এলো বঙ্গদর্শনের নবপর্যায় যুগ। রবীন্দ্রনাথের চোখেরবালি তখন ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে। ভাষা ও প্রকাশভঙ্গীর একটা নৃতন আলো এসে যেন চোখে পড়ল। সেদিনের সে গভীর ও সুতীক্ষ আনন্দের স্মৃতি আমি কোনদিন ভুলব না। কোন কিন্তু যে এমন করে বলা যায়, অপরের কল্পনার ছবিতে নিজের মনটাকে যে পাঠক এমন চোখ দিয়ে দেখতে পায়, এর পূর্বে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। এত দিনে শুধু কেবল সাহিত্যের নয়, নিজেরও যেন একটা পরিচয় পেলাম। অনেক পড়লেই যে তবে অনেক পাওয়া যায়, একথা সত্য নয়। ওইতো খানকয়েক পাতা, তার মধ্য দিয়ে যিনি এত বড় সম্পদ সেদিন আমাদের হাতে পৌঁছে দিলেন, তাকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা পাওয়া যাবে কোথায়?

এর পরেই সাহিত্যের সঙ্গে হ'ল আমার ছাড়াছাড়ি, ভুলেই গেলাম যে, জীবনে একটা ছত্রও কোন দিন লিখেছি। দীর্ঘকাল কাটলো প্রবাসে, ইতিমধ্যে কবিকে কেন্দ্র করে কি ক'রে যে নবীন বাংলা সাহিত্য দ্রুতবেগে সমৃদ্ধিতে ভ'রে উঠলো আমি তার কোন খবরই জানিনে। কবির সঙ্গে কোনদিন ঘনিষ্ঠ হবারও সৌভাগ্য ঘটেনি, তার কাছে ব'সে সাহিত্যের শিক্ষা গ্রহণেরও সুযোগ পাইনি, আমি ছিলাম একেবারে বিচ্ছিন্ন। এইটা হ'ল বাইরের সত্য, কিন্তু অন্তরের সত্য সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই বিদেশে আমার সঙ্গে ছিল কবির খানকয়েক বই - কাব্য ও সাহিত্য- এবং মনের মধ্যে ছিল পরম শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। তখন ঘুরে ঘুরে ওই ক'খানা বই-ই বারবার ক'রে পড়েছি— কি তার ছন্দ, কটা তার অক্ষর, কাকে বলে আর্ট, কি তার সংজ্ঞা, ওজন মিলিয়ে কোথাও কোন ত্রুটি ঘটেছে কি না— এসব বড় কথা কখনো চিন্তাও করিনি— ওসব ছিল আমার কাছে বাহুল্য। কেবল সুদৃঢ প্রত্যয়ের আকারে মনের মধ্যে এইটুকু ছিল যে, এর চেয়ে পূর্ণতর সৃষ্টি আর কিছু হ'তেই পারে না। কি কাব্যে, কি কথাসাহিত্যে, আমার ছিল এই পুঁজি।

একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ যখন সাহিত্যসেবার ডাক এল, তখন যৌবনের দাবী শেষ ক'রে প্রৌটত্বের এলাকায় পা দিয়েছি। দেহ শ্রান্ত, উদ্যম সীমাবদ্ধ।_ শেখবার বয়স পার হ'য়ে গেছে। থাকি প্রবাসে, সব থেকে বিচ্ছিন্ন, সকলের কাছে অপরিচিত, কিন্তু আহবানে সাড়া দিলাম— ভয়ের কথা মনেই হ'ল না।

.. আমার শৈশব ও যৌবন ঘোর দারিদ্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। অর্থের অভাবেই আমার শিক্ষালাভের সৌভাগ্য ঘটেনি। পিতার নিকট হ'তে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্যানুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকারসূত্রে আর কিছুই পাই নি। পির্তৃদত্ত প্রথম গুণটি আমাকে ঘরছাড়া করেছে—আমি অল্প বয়সেই সারা ভারত ঘুরে এলাম আর পিতার দ্বিতীয় গুণের ফলে জীবন ভ'রে আমি কেবল স্বপ্ন দেখেই গেলাম। আমার পিতার পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা— এক কথায় সাহিত্যের সকল বিভাগেই তিনি হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু কোনটাই তিনি শেষ করতে পারেননি। তাঁর লেখাগুলি আজ আমার কাছে নেই-_ কবে কেমন ক'রে হারিয়ে গেছে, সে কথা আজ মনে পড়ে না। কিন্তু কোনটাই তিনি শেষ করতে পারেননি। কিন্তু এখনও স্পষ্ট মনে আছে, ছোটবেলায় কতবার তার অসমাপ্ত লেখাগুলি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। কেন তিনি এগুলি শেষ ক'রে যান নি এই ব'লে কত দুঃখই না করেছি। অসমাপ্ত অংশগুলি কি হ'তে পারে ভাবতে ভাবতে আমার অনেক বিনিদ্র রজনী কেটে গেছে। এই কারণেই বোধহয় সতের বৎসর বয়সের সময়ে আমি গল্প লিখতে শুরু করি। কিন্তু কিছুদিন বাদে গল্প রচনা অ-কেজোর কাজ মনে ক'রে আমি অভ্যাস ছেড়ে দিলাম। তারপর অনেক বৎসর কেটে গেল। আমি যে কোনকালে একটি লাইনও লিখেছি সে কথা ভূলে গেলাম।

আঠার বৎসর পরে একদিন লিখতে আরম্ভ করলাম। কারণটা দৈবদুর্ঘটনারই মত। আমার গুটিকয়েক পুরাতন বন্ধু একটি ছোট মাসিকপত্র বের করতে উদ্যোগী হলেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠাবান  লেখকদের কেউই এই সামান্য পত্রিকায় লেখা দিতে রাজী হলেন না। নিরপায় হ'য়ে তাদের কেউ কেউ আমাকে স্মরণ করলেন। বিস্তর চেষ্ঠায় তারা আমার কাছ থেকে লেখা পাঠাবার কথা আদায় ক'রে নিলেন। এটা ১৯১৩ সনের কথা। আমি নিমরাজী হয়েছিলাম। কোন রকমে তাঁদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি লেখা দিতে স্বীকার হয়েছিলাম। উদ্দেশ্য একবার রেঙ্গুনে পৌছঁতে পারলেই হয়। কিন্তু চিঠির পর চিঠি আর টেলিগ্রামের তাড়া অবশেষে আমাকে সত্য সত্যই আবার কলম ধরতে প্ররোচিত করল। আমি তাঁদের নবপ্রকাশিত ‘যমুনা’র  জন্য একটি ছোট গল্প পাঠালাম। এই গল্পটি প্রকাশ হ'তে না হ'তেই বাংলার পাঠকসমাজে সমাদর লাভ করল। আমিও এক দিনেই নাম ক'রে বসলাম। তারপর আমি অদ্যাবধি নিয়মিতভাবে লিখে আসছি। বাংলাদেশে বোধ হয় আমিই একমাত্র সৌভাগ্যবান লেখক যাকে কোন দিন বাধার দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়নি।

ঋণ কি শুধু আমার পূর্ববর্তী পূজনীয় সাহিত্যাচার্যগণের কাছেই? সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উতপীড়িত মানুষ হয়েও মানুষ যাদের চোখের জলের কখনও হিসেব নিলে না, নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনদিন ভেবেই পেলে না সমস্ত থেকেও কেন তাঁদের কিছুতেই অধিকার নেই, এদের কাছেও কি ঋণ আমার কম? এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে। তাঁদের প্রতি কত দেখেছি অবিচার, কত দেখেছি কুবিচার, কত দেখেছি নির্বিচারে দুঃসহ সুবিচার। তাই আমার কারবার শুধু এদেরই নিয়ে। সংসারে সৌন্দর্যে সম্পদে ভরা বসন্ত আসে জানি, আনে সঙ্গে তার কোকিলের গান, আনে প্রস্ফুটিত মল্লিকা-মালতী-জাতি-যৃথী, আনে গন্ধব্যাকুল দক্ষিণা পবন। কিন্তু যে আবেষ্টনে দৃষ্টি আমার আবদ্ধ হয়ে গেল তার ভিতরে ওরা দেখা দিলে না। ওদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুযোগ আমার ঘটলো না। সে দারিদ্র্য আমার লেখার মধ্যে চাইলেই চোখে পড়ে। কিন্তু আন্তরে যাকে পাইনি, শ্রুতিমধুর শব্দরাশির অর্থহীন মালা গেঁথে তাকেই পেয়েছি ব'লে প্রকাশ করবার ধৃষ্টতাও আমি করি নি। এমনি আরও অনেক কিছুই— এ জীবনে যাদের তত্ত্ব খুঁজে মেলেনি স্পর্ধিত অবিনয়ে মর্যাদা তাদের ক্ষুণ্ণ করার অপরাধও আমার নেই। তাই সাহিত্যসাধনায় বিষয়বস্তু ও বক্তব্য আমার বিস্তৃত ও ব্যাপক নয়, তারা সংকীর্ণ, স্বল্পপরিসরবদ্ধ। তবুও এটুকু দাবী করি, জগতের অনুরঞ্জিত ক'রে তাদের আজও আমি সত্যভ্রষ্ট  করিনি।

চিরঞ্জীবী হবার আশা আমি করিনে। কারণ, সংসারে আনেক কিছুর মতো মানবমনেরও পরিবর্তন আছে, সুতরাং আজ যা বড়, আর একদিন তাই যদি তুচ্ছ হ'য়ে যায় তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। সেদিন আমার সাহিত্যসাধনার বৃহত্তর অংশও যদি অনাগতর অবহেলায় ডুবে যায়, আমি ক্ষোভ করব না। শুধু, মনে এই আশা রেখে যাব অনেক কিছু বাদ দিয়েও যদি সত্য কোথাও থাকে সেটুকু আমার থাকবে। সে আমার ক্ষয় পাবে না। ধনীর অজস্র ঐশ্বর্য নাই বা হ'ল, বাগ্দেবীর অর্ঘসম্ভারে এ স্বল্প সঞ্চয়টুকু রেখে যাবার জন্যই আমার আজীবন সাধনা। দিনের শেষে এই আনন্দ মনে নিয়ে খুশী হয়ে বিদায় নেবো-— ভেবে যাবো আমি ধন্য, জীবন আমার বৃথায় যায় নি।

0 Comments
Leave a reply