কয়েকদিন ধরে আমার স্ত্রী কারুযাকী বলল- অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয় নি। আমি বললাম, এইতো দু-তিনমাস হল গেলাম। পুজোর সময় সিমলা গেলাম। সেখান থেকে কসৌলী। কসৌলীর নির্জনতা, আর্মি পরিচালিত স্থানগুলির পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা, পরিশেষে হিমাচল ট্যুরিজম-র ব্রিটিশ আমলে তৈরী হোটেলঘর গুলির আকর্ষণ – সব মিলিয়ে তোমার ভালো লেগেছিল। তবুও সে নাছোড়বান্দা, বলল- ‘আরেকটু বেশী হলে ক্ষতি কী’।
অফিসে একটা অডিটের কাজ ছিল তেজপুরে। সেটাকে উপলক্ষ্য করে বেড়ানোর একটা পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলা হল। প্রথমে যাব বমডিলা, অরুণাচল প্রদেশ। সেখানে ২/৩ দিন, তেজপুরে ২/৩ দিন, তারপর ইটানগর - অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ২/৩ দিন। পরিকল্পনাটা কারুবাকীর মনে খুব ধরে গেল। সেই অনুযায়ী প্রথমে গেলাম গৌহাটি, ট্রেনে। তারপর একটা গাড়ি ভাড়া করে, ৭ ঘণ্টা চলার পর বমডিলা পৌঁছালাম। ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা। শীতে ঠকঠক করে কাঁপছি। একদিন গেলাম ডিরাঙ। চারদিকে পাহাড়ে পরিবেষ্টিত একটা বৌদ্ধগুম্পা। স্থানটা অদ্ভুত রকমের নির্জন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা।
বমডিলা (অরুণাচল প্রদেশ) থেকে নেমে সন্ধ্যা ৭ টার সময় এসে পৌঁছালাম তেজপুরে। প্রশান্তি টুরিস্ট লযে রাতে থাকার ব্যবস্থা হল। পরদিন শ্রী সঞ্জয় রায় - অ্যাকাউন্টস অফিসার, আমাদেরকে (কারুবাকী আর আমি) নিয়ে গেল অগ্নিগড় নামে একটা জায়গায়। এটা নাকি তেজপুরে ‘অবশ্যদ্রষ্টব্য’ স্থানের মধ্যে পড়ে। এখানে প্রস্তরফলকে ইংরাজীতে লেখা আছে :
অগ্নিগড় (ছবি - উইকিপিডিয়া)
AGNIGARH
According to Hindu Mythology, Agnigarh, a hillrock located in Tejpur, is the site of the fortress which was built by Banasur to keep his daughter Usha, in Isolation. The name is derived from the words Agni (Fire) and Garh (Fortress) in Sanskrit. Legend had it that the fortress was surrounded by fire at all times. So that nobody could go in or out of the perimeter without permission. There is a circular stairway leading upto the crest of the hill, where there are now sculptures. There is also a tall viewing platform from where the entire Tejpur town and vast Brahmaputra River can be seen.
জায়গাটা হল ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। এখানে নদী সবচেয়ে বেশী চওড়া ৭.৫ কিলোমিটার। এখন নদীর ভিতরে বিরাট পলি পড়েছে। একে শীতকাল, তার উপর চাইনিজরা ওদের সীমানায় বিরাট বাঁধ তৈরী করে জলের প্রবাহ রুখে দিয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রের আর আগের দাপট নেই। তবে আমরা যখন পৌঁছালাম তখন সূর্যাস্ত হচ্ছিল। সূর্যের লাল গোল ছবি, জলের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। অত্যন্ত নয়নাভিরাম দৃশ্য।
অগ্নিগড়ের পাহাড়ে (ছবি - লেখক)
এখানে অসুর রাজ- বাণাসুর (উনি হিরণ্যকশিপু, দ্বৈতকুলের সম্রাট ও প্রহ্লাদের বাবার পূর্বপুরুষ) এবং ওনার কন্যা ঊষা আর তার বান্ধবী চিত্রলেখার, পাথরে খোদাই মূর্তি আছে। চিত্রলেখা ভাল ছবি আঁকত। অনেক দিন ধরে রাজকন্যা ঊষার এক রাজপুত্রের কথা মনে হচ্ছিল। তিনি এই রাজপুত্রকে স্বপ্নে দেখছিলেন। একথা বান্ধবী চিত্রলেখাকে বললে, সে ঊষার বর্ণনা শুনে এই রাজপুত্রের ছবি আঁকে। ছবি আঁকা শেষ হলে দেখা গেল, রাজপুত্রের নাম অনিরুদ্ধ। সে শ্রী কৃষ্ণের নাতি।
অনিরুদ্ধ দেশভ্রমণে বেরিয়ে তেজপুর এসে পৌঁছালে, বাণাসুর কন্যা ঊষা ও বান্ধবী চিত্রলেখা তার সাথে গোপনে দেখা করতে যায়। দেখা হয় এবং দুজনেই একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। বাণাসুর একথা জানতে পেরে ভয়ানক রেগে যান। অসুরকুলের কন্যা, দেবতাকুলের পুত্রের সাথে বিয়ে করতে চায়? তৎক্ষনাৎ এর প্রতিকার হিসাবে সে ঊষা আর চিত্রলেখাকে বন্দী করে রাখে, একটা টিলার মতো উঁচু জায়গায়। এটা ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব পাড়ে। একটা গড় বানিয়ে চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা হয়। এটাই এখন অগ্নিগড়। বাণাসুর, অনিরুদ্ধকেও বন্দী করে রাখে। তার গলায়, হাতে, পিঠে, সাপ জড়িয়ে রাখার ব্যবস্থা করে। শ্রীকৃষ্ণ এই খবর পেয়ে দ্বারকা থেকে হুংকার ছাড়লেন। সেখান থেকে তেজপুরে আসতে সময় লাগবে। বাণাসুর এই সুযোগ কাজে লাগালেন। বাণাসুর ছিলেন শিবের খুব বড় ভক্ত। তিনি প্রবলভাবে শিবের পূজা করতে লাগলেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধে রাজী হলেন, যাতে ভক্তকে রক্ষা করা যায়। একবারও তিনি জানার চেষ্টা করলেন না যে অপরপক্ষে কে আছেন। Don’t belittle your opponents - একথা মনে আনলেন না। আমার মনে হয়, শিব ঠাকুরের মাথায় বুদ্ধি কম ছিল। যারা সব সময় ঘুমিয়ে থাকে, তাদের মাথা ভালো কাজ করে না। মোটামাথা হয়ে যায়। শিবের সব ছবি, সব মূর্তি দেখবেন, চোখ বন্ধ অবস্থায়, চক্ষু ঢুলুঢুলু।
যাহোক যুদ্ধক্ষেত্রে- তেজপুরে, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র ঘোরাতে শুরু করলেন। শিবঠাকুর চোখ বুজেছিলেন কি না কে জানে, তিনিও ত্রিশূল ঘোরাতে শুরু করলেন। বাণাসুর শিবের পিছনে দাঁড়িয়ে মজা লুটতে লাগলেন। এদিকে দেবলোকে বসে ব্রহ্মা সব টের পেলেন। বিপদ আসন্ন দেখে তিনি তাঁর বাহন–এ চেপে তেজপুর পৌঁছে গেলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তিনি শিব ও কৃষ্ণকে যুদ্ধ থেকে বিরত করলেন। ব্রহ্মা শিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কী জন্যে এ যুদ্ধ করছেন তা কি জানেন? শিব বললেন – না জানিনা। ব্রহ্মা বুঝিয়ে বললেন। শিবঠাকুর লজ্জা পেয়ে জিভ কামড়ে নিলেন। ভক্ত বাণাসুরকে শিব অনুরোধ করলেন - আরে ইয়ার, এই ‘বিবাহ’ দিয়ে দে। আগে জানলে আমি আসতামই না। তখন বাণাসুর, শিব, ব্রহ্মা ও শ্রীকৃষ্ণ সবাই মিলে অগ্নিগড় গেলেন। আগুন নেভানো হল। যুবক অনিরুদ্ধকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে সেখানে আনা হল। সবার সামনে গান্ধর্বমতে চার হাত এক হল। অনিরুদ্ধ উষাকে বিয়ে করল। পরদিন শ্রীকৃষ্ণ, পুত্র ও পুত্রবধূকে নিয়ে দ্বারকায় ফিরে গেলেন।
এই কাহিনী আরও বিশদভাবে ভাগবত-পুরাণে লেখা আছে। আর তেজপুরে পাথরে খোদাই নানা মূর্তি তৈরি করে এই কাহিনীর বর্ণনা করা আছে। অনিরুদ্ধ, ঊষা ও ঊষার বান্ধবী চিত্রলেখা- এদের মুখাবয়ব কি অপূর্ব জ্যোতি দিয়ে মূর্তিকর গড়েছেন। তবে তিনি বাণাসুরের মূর্তিটা, নির্দয়ভাবে, যতটা খারাপ করে গড়া যায়, তাই করেছেন। দক্ষিণভারতীয় ধীবরদের মত কালো কুচকুচে, ধ্যাবড়া মোটা মুখ, রুক্ষ শুষ্ক, এক অত্যন্ত রাগী মানুষ হিসাবে গড়েছেন। অথচ বাণাসুরের দোষ কি? পিতার সম্মতি ছাড়া, কন্যা কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে, অনেক পিতাই এরকম কাজ করবেন। বাণাসুরের মুখটা কন্যাবৎসল পিতার মুখের অবয়বে গড়লে অনেকের ভালো লাগত। যেমনভাবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মেঘনাদবধ কাব্যে, মেঘনাদ ও তাঁর পিতা রাবণকে, দৈত্যকুলপতি না দেখিয়ে, রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে দেখিয়েছেন।
05 February, 2025
Excellent narrative of the story of Agnigarh- not many people know about it- Parimal- keep traveling and writing such stories of our heritage places-
07 February, 2025
Interesting story told in simple storytelling style. Enjoyed reading. Parimal keep writing ✍️
12 February, 2025
তোমার বেড়ানোর বর্ননা পড়ে খুব ভাল লাগল। ঐতিহাসিক কাহিনী ও বর্তমান মেলবন্ধন মধ্যে একটা আলাদা অনুভুতি জাগে।